Ajker Patrika

এনএসইজেডে পানি প্রকল্প: দুর্বল পরিকল্পনায় তিন বছরের কাজ গড়াল সাত বছরে

  • প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে ১২৯ কোটি টাকা
  • পানি শোধনাগারের কাজ হয়েছে ৫৫%
  • বিলম্বে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি
মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা
এনএসইজেডে পানি প্রকল্প: দুর্বল পরিকল্পনায় তিন বছরের কাজ গড়াল সাত বছরে

দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড)। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নিয়ে শিল্পাঞ্চলটিতে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালে নেওয়া হয়েছিল ‘জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পানি শোধনাগার ও গভীর নলকূপ স্থাপন’ প্রকল্প। তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির অর্ধেক কাজ শেষ হয়নি। এ সময়ে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২৯ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দীর্ঘসূত্রতার পেছনে শুধু বাহ্যিক কারণ নয়, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ২০১৯ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি শুরু করে। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়। সম্প্রতি প্রকল্প পরিচালনা কমিটি (পিএসসি) আবারও সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত নেওয়ার সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ তিন বছরের প্রকল্প শেষ হতে লাগছে প্রায় সাত বছর।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যয়ও। প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৩২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। পরে সংশোধিত ডিপিপিতে তা বেড়ে ৭৬১ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হয়েছে প্রায় ১২৯ কোটি টাকা। অথচ চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৫১ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ।

আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—প্রতিদিন ৫০ মিলিয়ন লিটার ক্ষমতার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের কাজ এগিয়েছে মাত্র ৫৫ শতাংশ। প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রান্সমিশন পাইপলাইন নির্মাণের অগ্রগতি আরও কম, মাত্র ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পকারখানায় পানি সরবরাহের জন্য এ দুটি অবকাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে প্রকল্পের তুলনামূলক সহজ কাজগুলো প্রায় শেষ হয়েছে। ২৩টি গভীর নলকূপ, পাম্প হাউস ও বিতরণ নেটওয়ার্কের কাজ ৯৪ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। প্রবেশ সড়ক, সেতু নির্মাণ, ভূমি উন্নয়ন ও জমি অধিগ্রহণের কাজও শতভাগ শেষ। এতে প্রশ্ন উঠেছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর বাস্তবায়ন কেন শুরু থেকেই পিছিয়ে রইল।

প্রতিবেদনে বিলম্বের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক দরপত্রে দীর্ঘসূত্রতা, কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব, বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিলম্ব এবং বর্ষাকালে কাজ ব্যাহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আইএমইডি একই সঙ্গে প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘাটতির বিষয়েও পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে এসব ঝুঁকি আগেভাগে বিবেচনায় এনে সময়সূচি ও বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ করা উচিত ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দুর্বল সমীক্ষা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। এতে সরকারের সময় যেমন নষ্ট হয়েছে, তেমনি প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যে লক্ষ্য সামনে রেখে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো অর্জিত হয়নি।

এই বিলম্বের প্রভাব শুধু একটি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ পাওয়া অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ উৎপাদন শুরুর পূর্বশর্ত। পানি অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকলে কারখানা চালু বিলম্বিত হবে, বিনিয়োগের অর্থ দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকবে, সুদের ব্যয় বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ফলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের সরকারি লক্ষ্যও পিছিয়ে যেতে পারে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। তিনটি পাম্প হাউসে চুরির ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীলতা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমিয়ে দিতে পারে বলে কৃত্রিম ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং দ্রুত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হবে। একই সঙ্গে কোনো দুর্বলতা থাকলে সেটা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন বলছে, প্রকল্পটির ব্যয় ও সময় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে শুধু বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতা নয়, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতাও দায়ী। সময়মতো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পায়নের গতি আরও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত