Ajker Patrika

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন: আমানতের উচ্চ সুদে বাড়ছে ঝুঁকি

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন: আমানতের উচ্চ সুদে বাড়ছে ঝুঁকি
প্রতীকী ছবি

দেশের কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক বাজারের প্রচলিত হারের চেয়ে ২ থেকে ৪ শতাংশ বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছে। প্রথম নজরে এটি আমানতকারীদের জন্য লাভজনক মনে হলেও, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন বলছে, এই উচ্চ সুদের পেছনে রয়েছে দুর্বল ব্যাংকগুলোর তীব্র তারল্য সংকট। ফলে বেশি সুদের প্রলোভনের আড়ালে বাড়ছে আমানতকারী ও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত কোনো কোনো ব্যাংক আমানতের ওপর ১২ শতাংশের বেশি সুদ দিয়েছে। সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়ার আগে যেখানে গড় হার ছিল ৬ থেকে ৮ শতাংশ, সেখানে বর্তমান হার প্রায় দ্বিগুণ। এক বছরের বেশি মেয়াদি আমানতে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ০২ শতাংশ সুদ দিয়েছে সিটিজেনস ব্যাংক। এরপর রয়েছে এবি ব্যাংক (১১.৭৯ শতাংশ), মেঘনা ব্যাংক (১১.৭৭ শতাংশ), এনআরবি ব্যাংক (১১.৬৭ শতাংশ), বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক (১১.৬৬ শতাংশ), বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক (১১.৬৪ শতাংশ), মধুমতি ব্যাংক (১১.৬৩ শতাংশ), ন্যাশনাল ব্যাংক (১১.৪২ শতাংশ), কমিউনিটি ব্যাংক (১১.১৯ শতাংশ) এবং আইএফআইসি ব্যাংক (১১.১৮ শতাংশ)। এক বছরের কম মেয়াদি আমানতেও কয়েকটি ব্যাংক ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, উচ্চ সুদের এই প্রতিযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে ঋণের সুদ ও বিনিয়োগে। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট, খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সুদের প্রতিযোগিতার মূল কারণ মুনাফা বাড়ানো নয়, বরং টিকে থাকার চেষ্টা। কয়েকটি ব্যাংক বাধ্যতামূলক তারল্য অনুপাত, ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) ও স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি রেশিও (এসএলআর) বজায় রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। এমনকি কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতেও সমস্যায় পড়েছে। তাই পুরোনো আমানত ধরে রাখা, নতুন আমানত সংগ্রহ এবং দৈনন্দিন নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে তারা উচ্চ সুদের কৌশল নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনিয়ম, বেনামি ঋণ, দুর্বল পরিচালনা ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে অনেক গ্রাহক অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ব্যাংকে চলে যাচ্ছেন।

বাজারভিত্তিক সুদের হার চালুর পর ব্যাংকগুলো সুদ নির্ধারণে বেশি স্বাধীনতা পেয়েছে। সেই সুযোগে দুর্বল কিছু ব্যাংক আগ্রাসীভাবে আমানত সংগ্রহ করছে, বিপরীতে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদেই পর্যাপ্ত আমানত পাচ্ছে।

এনআরবি ব্যাংকের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রিয়াজ খান বলেন, তারল্য সংকট কাটাতে কিছু ব্যাংক বেশি সুদে আমানত নিচ্ছে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সংকটের কারণে এনআরবি ব্যাংককেও কিছুটা বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হয়েছে।

ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অস্বাভাবিক নয়। তাঁর ভাষ্য, আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে অর্থ নিলে উচ্চ সুদ দিতে হয় এবং দ্রুত তা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আমানত সংগ্রহ করলে অর্থ দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যায়, যা নগদ অর্থের সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হয়।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই কৌশল দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ১২ শতাংশ সুদে আমানত নিলে ঋণ আরও বেশি সুদে বিতরণ করতে হয়। এতে মানসম্পন্ন ঋণগ্রহীতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, ব্যাংকের মুনাফা কমে এবং খেলাপি ঋণ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই শুধু বেশি সুদের প্রলোভন দেখে আমানত না রেখে ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন, খেলাপি ঋণের হার, মূলধন পর্যাপ্ততা ও সুশাসনের অবস্থা বিবেচনা করা উচিত।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ শতাংশে সীমিত রাখার নির্দেশনা দিয়েছে। নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সুদ নিয়ে অসম প্রতিযোগিতা কমানোর পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, একীভূতকরণ ও সুশাসন নিশ্চিতের কাজ চলছে। এ ছাড়া গত ৩০ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে, যা আজ রোববার থেকে কার্যকর হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আশা, এতে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের ব্যয় কমবে এবং উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহের অসুস্থ প্রতিযোগিতাও কিছুটা কমতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধান উচ্চ সুদ নয়; খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন শক্তিশালী করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে জরুরি। কারণ উচ্চ সুদের প্রতিশ্রুতি যত বাড়ছে, আমানতকারীদের ঝুঁকিও তত বাড়ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত