Ajker Patrika

ডিসিসিআইয়ের ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন: মন্থর হচ্ছে অর্থনীতির চাকা

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
ডিসিসিআইয়ের ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন: মন্থর হচ্ছে অর্থনীতির চাকা
মতিঝিলে গতকাল আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই): ঢাকার সামষ্টিক অর্থনীতির ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে অতিথিরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাবে দেশের অর্থনীতির গতি ক্রমেই শ্লথ হয়ে পড়ছে। শিল্প খাতে উৎপাদন চাপের মুখে, সেবা খাতে চাহিদা কমছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির তাৎক্ষণিক অবস্থা বোঝার জন্য নতুন এক মূল্যায়ন কাঠামো সামনে এনেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।

শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটরিয়ামে আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই): ঢাকার সামষ্টিক অর্থনীতির ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এই সূচক প্রকাশ করা হয়। ব্যবসা, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির বাস্তব চিত্র দ্রুততম সময়ে তুলে ধরতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে আছে, বিনিয়োগে গতি নেই, জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যাচ্ছে। তাঁর মতে, প্রচলিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক প্রতিফলন দিতে পারে না। ফলে নীতিনির্ধারণেও দেরি হয়। তাই ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অর্থনৈতিক অবস্থান মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে ডিসিসিআই।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী। তিনি জানান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী তথ্যের ঘাটতি পূরণ করতেই ‘ইকোনমিক পজিশন ইনডেক্স’ বা ইপিআই প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই গবেষণায় মোট ৭৬২ জনের মত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উৎপাদন খাতের ৩৩০ জন এবং সেবা খাতের ৪৩২ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে চাপ তৈরি হচ্ছে। জ্বালানিসংকটে শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সেবা খাতের সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাজারব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহ চেইন উন্নয়ন, এসএমই উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে হয়রানি কমানোর সুপারিশ করা হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, গবেষণাটি এখন ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও এটি সারা দেশে সম্প্রসারণ করা গেলে নীতিনির্ধারণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তাঁর মতে, এ ধরনের সূচক উদ্যোক্তাদের ব্যবসার পরিবেশ মূল্যায়নে সহায়তা করবে।

অর্থনীতিবিদেরা বলেন, দেশের অর্থনীতির মূল দুর্বলতা এখন বিনিয়োগ ও আর্থিক খাতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, কয়েক বছর ধরে সরকারি ও বেসরকারি খাতে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, পাশাপাশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে গেছে। তিনি আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ এবং আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা। তিনি জানান, ব্যবসা সহজ করতে সরকার আমদানি নীতিমালা যুগোপযোগী করতে কাজ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আখন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসেন বলেন, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য দেশের পুঁজিবাজার এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত