Ajker Patrika

বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী: দুই বছরে ঘুরে দাঁড়াবে দেশ

  • ৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন হলেই বাজেট সফল
  • মূল্যস্ফীতি কমবে সংস্কারে, অভিযানে নয়
  • সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে সামাজিক সুরক্ষায়
  • বেতন বাড়লে সরকারি কর্মীদের দুর্নীতি কমবে
বিশেষ প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী: দুই বছরে ঘুরে দাঁড়াবে দেশ
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘এটি শুধু আরেকটি বাজেট নয়, অর্থনীতির গতিপথ বদলের একটি রূপরেখা’—২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এমন বার্তাই দিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারের বাজেট প্রচলিত ধারা থেকে ভিন্ন দাবি করে তিনি বলেছেন, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ, সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ, গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ এবং দীর্ঘদিন মূলধারার বাইরে থাকা মানুষকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করাই এর মূল লক্ষ্য। পরিকল্পনার ৮০ শতাংশও বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশাবাদী।

জাতীয় সংসদে গত বৃহস্পতিবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এর পরপরই মূল্যস্ফীতি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংকট, কালোটাকা, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাজেটের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসে।

প্রতিবছরের বাজেট-পরবর্তী রেওয়াজ অনুযায়ী এসব প্রশ্নের জবাব দিতে এবং সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বাজেটের পরদিন গতকাল শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন; শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন; কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ; পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি; প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ; প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থসচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

সব মানুষের জন্য বাজেট

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জনগণের প্রকৃত প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি বাজেটে। এবার ধনী-গরিব, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও পেশানির্বিশেষে সবার কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সবার জন্য বাজেট দেওয়া হয়েছে। সরকারে আসার পর মাত্র দেড় থেকে দুই মাস সময়ে বাজেট প্রস্তুত করলেও এমন কোনো শ্রেণি নেই, যাদের কথা ভাবা হয়নি। তিনি বলেন, অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থাকা মানুষকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করাই সরকারের লক্ষ্য। অর্থনীতিকে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর হাত থেকে বের করে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চায় সরকার।

৮০ শতাংশ বাস্তবায়নই যথেষ্ট

এই বাজেট শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, এর সঙ্গে বাস্তবায়নের একটি স্পষ্ট রূপরেখাও যুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পনার ৮০ শতাংশও বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। তাঁর মতে, গ্রামীণ অর্থনীতি, সৃজনশীল অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিনিয়োগবান্ধব সংস্কারের সমন্বয়ই আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হবে।

পিটিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় না

মূল্যস্ফীতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু বলেন, পুলিশ, র‍্যাব বা প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন।

কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির চাপ যুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ব্যবসায়িক ব্যয় কমাতে সরকার সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

বেতন বাড়লে কমবে দুর্নীতি

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে নতুন পে স্কেল হয়নি। এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, মানুষের যখন আর্থিক সংকট থাকে, তখন দুর্নীতির দিকে ঝোঁকার প্রবণতা তৈরি হয়। জীবনযাত্রার মান উন্নত হলে দুর্নীতিও কমবে বলে সরকার আশা করছে।

সামাজিক সুরক্ষায় সর্বোচ্চ জোর

গরিব মানুষের আয় বৃদ্ধির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এত বড় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আগে দেখা যায়নি। তাঁর মতে, শুধু ভাতা নয়, দক্ষতা তৈরি করে মানুষকে আয়ক্ষম করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

কালোটাকার সুযোগ নেই

এক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, এবারের বাজেটে কালোটাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। তবে জমির মৌজা মূল্য ও প্রকৃত বাজারমূল্যের পার্থক্যের কারণে যে জটিলতা তৈরি হয়, তা নিরসনের জন্য কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, মৌজা মূল্যকে প্রকৃত বাজারমূল্যের কাছাকাছি আনতে কাজ চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ আরও সংকুচিত হবে।

ব্যাংকের এক-তৃতীয়াংশ টাকা ‘চুরি’

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতের বড় অংশ সংকটে রয়েছে; কারণ, ব্যাংক থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ টাকা চুরি হয়ে গেছে। এসব অর্থ উদ্ধারে গঠিত টাস্কফোর্স কাজ করছে এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ ফ্রিজ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

গভর্নর বলেন, চুরি হওয়া টাকা ফেরত আনা কঠিন হলেও প্রচেষ্টা বন্ধ হবে না। যারা অর্থ পাচার করেছে, তাদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না। ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে আগামী ১ জুলাই থেকে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার ঘোষণাও দেন গভর্নর। তাঁর মতে, একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকেরা লেনদেন করতে পারবেন। এতে ডিজিটাল অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হবে।

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আতঙ্ক নয়

ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতার বিষয়ে গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো অনিয়মতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ করেনি। বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় নিয়ম অনুযায়ী নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে থাকা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। আমানতকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ঋণখেলাপির অভিযোগও সংবাদ সম্মেলনে খণ্ডন করেন গভর্নর। তিনি বলেন, গভর্নর হওয়ার আগে একটি রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুদের হার পরিবর্তন, কোভিডসহ নানা কারণে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব হয়েছিল, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কখনো ঋণ মওকুফ চায়নি এবং ইতিমধ্যে ১০০ কোটির বেশি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে।

ক্যাপাসিটি চার্জে বাধ্যবাধকতা

ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সমালোচনার জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, আগের সরকারের করা অনেক বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি সার্বভৌম গ্যারান্টির আওতায় হওয়ায় একতরফাভাবে পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত। তিনি বলেন, জোর করে এসব চুক্তি বাতিল করা হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

গ্রাম ও সৃজনশীল অর্থনীতির বাজেট

অর্থমন্ত্রী বলেন, বড় বড় মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে থিয়েটার, শিল্পকলা, বিনোদন, নকশা ও পর্যটনভিত্তিক একটি সমন্বিত ক্রিয়েটিভ সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দুই বছরে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। তবে সংস্কার, বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত