Ajker Patrika

পুনঃ তফসিল সুবিধার পরও বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা

  • মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
  • ডিসেম্বর শেষে ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
পুনঃ তফসিল সুবিধার পরও বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি

ব্যাংকঋণ পুনঃ তফসিলের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে। সে লক্ষ্যে গত বছর সেপ্টেম্বরে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে আরও ছাড় দিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া এক নির্দেশনায় এককালীন জমার মাত্র ১ শতাংশ পরিমাণ অর্থ জমা দিয়েই ঋণ পুনঃ তফসিলকরণ সুবিধা তৈরি করা হয়। কিছুদিনের জন্য তার প্রভাবও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে খেলাপি ঋণ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। ফলে এক প্রান্তিকের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

একই সময়ে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশই এখন খেলাপি। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের প্রতি তিন টাকার প্রায় এক টাকা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ব্যাংকার ও সংশ্লিষ্টদের মতে, পুনঃ তফসিল কোনো ঋণ আদায়ের স্থায়ী সমাধান নয়। কোনো ঋণ পুনঃ তফসিল করা হলে তা সাময়িকভাবে খেলাপির তালিকা থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু গ্রাহক যদি নতুন শর্ত অনুযায়ী কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে সেই ঋণ আবার খেলাপি হিসেবে ফিরে আসে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এমন অনেক ঋণ পুনরায় খেলাপিতে পরিণত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া বড় ঋণগ্রহীতাদের একটি অংশ এখনো আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে বিতর্কিতভাবে ঋণ পাওয়া কিছু শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ শ্রেণীকরণ হলে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠা। দীর্ঘদিন নানা বিশেষ সুবিধা, ঋণ পুনর্গঠন ও নীতিগত ছাড়ের মাধ্যমে অনেক দুর্বল ঋণকে খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। কিন্তু এখন অনেক ঋণ নতুন করে শ্রেণীকরণ হওয়ায় প্রকৃত ঝুঁকি সামনে আসছে।

অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতিও খেলাপি বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। উচ্চ সুদহার, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে চাহিদার দুর্বলতা এবং নগদ অর্থপ্রবাহের সংকটে অনেক উদ্যোক্তা নির্ধারিত সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে নতুন খেলাপি ঋণও তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এখনো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। মার্চ শেষে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। যদিও আগের প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা কমেছে, তারপরও তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশই খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের শিকড় আরও গভীরে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে সরকারের মেয়াদ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত