Ajker Patrika

যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেল সংকট: সেচ নিয়ে বিপাকে বাংলাদেশের কৃষক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেল সংকট: সেচ নিয়ে বিপাকে বাংলাদেশের কৃষক
বোরো চাষের ভরা মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেল জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন হাজার হাজার কৃষক। ছবি: রয়টার্স

রাজধানী ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইউসুফ। কৃষিকাজ করে সংসার চলে তাঁর। এবার গ্রীষ্মকালীন বোরো মৌসুমে ধান চাষ করেছেন। জমির পাশে হাঁটতে হাঁটতে শুকনো মাটিতে ধুঁকতে থাকা সদ্য রোপণ করা ধানের চারাগুলো দেখালেন। বললেন, ‘ধান ফলাতে না পারলে আমরা কী খাব? এই ধানই আমাদের একমাত্র সম্বল। এটি দিয়েই সংসার চলে। জ্বালানি সংকটের কারণে আমরা এখন গভীর বিপদে আছি।’

ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে। বোরো চাষের এই ভরা মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেল জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন হাজার হাজার কৃষক।

বাংলাদেশের পরিশোধিত জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে দামের অস্থিরতা ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানির জোগান সংকুচিত হয়েছে। সরকার জ্বালানি সাশ্রয় ও নতুন উৎস খোঁজার উদ্যোগ নিলেও কৃষকেরা বলছেন, তাঁরা কঠিন পরিস্থিতিতে মুখোমুখি হয়েছেন।

দুই সন্তানের বাবা ইউসুফ জানান, অনিশ্চয়তা এখন তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তাঁর প্রার্থনা শুধু একটাই, নিজের জমিতে কাজ করা এবং সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া।

১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে প্রধান খাদ্যশস্য ধান। মার্চের শেষে এই সময়টি প্রধান গ্রীষ্মকালীন ধান আবাদ (বোরো) শুরুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডিজেলের ঘাটতি, রেশনিং এবং পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনের কারণে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে ধানের ফলন ও উৎপাদন কম হওয়া এবং কৃষকদের লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।

ইউসুফ দিনে ডিজেলের জন্য লাইনে দাঁড়ান আর রাতে জমিতে কাজ করেন। জ্বালানি পাম্পগুলোতে প্রায়ই ‘তেল নেই’ লেখা ব্যানার ঝুলতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘সারাদিন পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি, তারপর অন্ধকারে মাঠে এসে সেচ দেওয়া, লাঙল চালানো আর সার দেওয়ার কাজ করি। গত কয়েক সপ্তাহে দিনে কেউ কাজ করতে পারেনি। সবাই লাইনে আটকে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি সারা দিন অপেক্ষা করেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।’

জ্বালানি পাওয়া গেলেও তা দেওয়া হচ্ছে অত্যন্ত সীমিত আকারে। ইউসুফ জানান, জনপ্রতি ৫ লিটারের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা দুই-তিনজন মিলে গেলে হয়তো কোনোদিন ভাগ্যগুণে ১০-১৫ লিটার পাই। যা দিয়ে মাত্র দুই-তিন দিন সেচ দেওয়া যায়।’

তাঁর চারপাশের খেতগুলো ফেটে চৌচির হয়ে আছে, ধানের চারা হলদেটে হয়ে যাচ্ছে। সেচ পাম্পগুলো শেষ বিন্দু ডিজেল দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। ইউসুফ আক্ষেপ করে বলেন, ‘জমির দিকে তাকিয়ে দেখেন, সব শুকিয়ে যাচ্ছে। আমরা ঠিকমতো পানি দিতে পারছি না।’

এদিকে জ্বালানি পাম্পের কর্মীরাও বলছেন, চাহিদা মেটাতে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন। স্থানীয় একটি পাম্পের ব্যবস্থাপক আব্দুল সালাম বলেন, ‘এই মৌসুমে কৃষকদের প্রচুর তেলের প্রয়োজন হয়। আমরা সরকারি নির্দেশনা মেনে চলছি, কিন্তু যে পরিমাণ সরবরাহ পাচ্ছি তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম।’

তবে সব কৃষকের অবস্থা এখনই ইউসুফের মতো নয়। ৭৫ বছর বয়সী ওসমান আলী জানান, সংকট তীব্র হওয়ার আগেই তিনি কিছু তেল মজুত করে রেখেছিলেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে জমানো তেল ফুরিয়ে যাবে। তখন সবাইকেই ভুগতে হবে।’

বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে সেচ কাজের জন্য ডিজেল-চালিত পাম্প এখনো অপরিহার্য। চাষের শুরুতে সরবরাহে এমন টান পড়ায় কৃষকদের আশঙ্কা, এই বিঘ্ন উচ্চমূল্যের খাদ্যবাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ইউসুফের ভাষায়, ‘বিশ্বে কী ঘটছে, তাতে আমাদের কোনো হাত নেই। কিন্তু তার মাশুল আমাদেরই দিতে হচ্ছে।’

জ্বালানি সংকটের উৎস বাংলাদেশের সীমানার অনেক দূরে হলেও এর প্রভাব সরাসরি এখানে পড়ছে। ইউসুফ বলেন, ‘ইরানকে কেন্দ্র করে চলা এই যুদ্ধ আমাদের ওপরও আঘাত হেনেছে। আমাদের মতো গরিব মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। আমরা শুধু চাই এই যুদ্ধ শেষ হোক, যেন আমরা চাষবাস করে শান্তিতে থাকতে পারি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত