
জোরপূর্বক শ্রম কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর আবার অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এর মধ্যে বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশের ওপর ১০ শতাংশ এবং বাকি ৪৫টি দেশের ওপর সাড়ে ১২ শতাংশ হারে শুল্ক বসানোর কথা বলা হয়েছে।
এখনো এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, তবে প্রস্তাবটি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এই উদ্যোগ বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিকে আবারও জটিল করে তুলতে পারে।
সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে দ্রুত মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। বাংলাদেশ কোনো ভিত্তিতে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চাওয়া হবে। প্রয়োজনে ভার্চুয়াল বা সরাসরি বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) তাদের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। ওই ধারা অনুযায়ী মার্কিন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর, অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক বিদেশি নীতি ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে সংস্থাটির।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্কের সময়সীমা আগামী ২৪ জুলাই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগ দিয়ে ইউএসটিআর নতুন শুল্ক প্রস্তাব করল।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই দিনের পর থেকে আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অধীনে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা বাতিল করেছে।
ইউএসটিআরের প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব অর্থনীতি ইতিমধ্যে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে অথবা বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। অন্যদিকে যেসব অর্থনীতি এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন করেনি, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর মধ্যে ইউএসটিআর বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে সেই ১৫টি দেশের তালিকায়, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে যে তারা জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। এই তালিকায় আছে কানাডা, ইকুয়েডর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও যুক্তরাজ্য। বাকি ৪৫টি দেশের পণ্যের ওপর সাড়ে ১২ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুল্কের হার নয়, বরং অভিযোগের প্রকৃতি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যদি ভবিষ্যতে জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত বিষয়কে বাণিজ্যিক শর্ত হিসেবে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করে, তাহলে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট শিল্প বা পণ্যের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ নয়; বরং জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বৈশ্বিক প্রবাহ ঠেকানোর যুক্তিতে সামগ্রিক বাণিজ্য নীতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইউএসটিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমানো হলে বৈশ্বিক বাজারে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকেরা অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এটি শুধু একটি শুল্ক প্রস্তাব নয়, বরং বাণিজ্যের সঙ্গে শ্রমমান ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার একটি প্রচেষ্টা। ফলে অভিযোগের ভিত্তি কী, কোন তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি কী ধরনের বাণিজ্যিক প্রভাব ফেলতে পারে—এসব বিষয় দ্রুত খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উভয় পর্যায়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুকে বাণিজ্য নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। প্রায় এক শতাব্দী ধরে দেশটি ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের ৩০৭ ধারার মাধ্যমে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে রেখেছে। ফলে বর্তমান উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে বৃহত্তর বাণিজ্য নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে দেশের রপ্তানিকারকেরা ইউএসটিআরের এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাংলাদেশের শ্রম আইন ও শিল্পকাঠামোর মধ্যে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। তৈরি পোশাকসহ দেশের কোনো শিল্প খাতেই এ ধরনের শ্রমচর্চার বাস্তব ভিত্তি নেই। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রশাসন নতুন বাণিজ্যিক ব্যবস্থার পথ খুঁজছে এবং বর্তমান প্রস্তাব সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যদি কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য থাকে, তাহলে সেটি প্রকাশ করা উচিত বলে জানান বিকেএমইএর সভাপতি। তিনি বলেন, অন্যথায় এমন অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তবে এ বিষয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। দেশের স্বার্থে সরকার, বিকেএমইএ, বিজিএমইএ এবং বেসরকারি খাত একযোগে বিষয়টি মোকাবিলা করবে।
একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের আরেক সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম যুক্ত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব কারখানা, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা মানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী অবস্থানে রয়েছে। ফলে এমন অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মাহমুদ হাসান বলেন, বিষয়টির ওপর বিজিএমইএ নিবিড় নজর রাখছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমর্থনও চাওয়া হবে, যাতে বাংলাদেশের শ্রমমান ও উৎপাদন বাস্তবতা যথাযথভাবে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরা যায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল কাজ রয়েছে। একদিকে অভিযোগের বাস্তবতা ও তথ্যভিত্তি যাচাই করে কূটনৈতিকভাবে আপত্তি জানাতে হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমমান, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা এবং আমদানি-রপ্তানি তদারকি ব্যবস্থার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তভাবে তুলে ধরতে হবে। কারণ, বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্রমেই শুধু পণ্যের গুণগত মান নয়, উৎপাদনের প্রক্রিয়া, শ্রম অধিকার এবং সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপরও নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
ইউএসটিআরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের আওতায় থাকা অর্থনীতিগুলো থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির প্রায় ৯৯ দশমিক ৪০ শতাংশ আসে। ফলে এই উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, উৎপাদন নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।

দেশের রপ্তানি আয়ে আবারও পতন দেখা দিয়েছে। বিদায়ী মে মাসে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৪০ কোটি ২৮ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ কম। তবে আগের মাস এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে রপ্তানি আয় প্রায় ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ বেড়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে
অর্থমন্ত্রী বলেন, যে অর্থনীতি বাংলাদেশের মানুষের বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারবে এবং যে উন্নয়নের স্বপ্ন আমরা দেখাতে চেষ্টা করছি, ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির দিকে আমরা যাচ্ছি। সেটা যাতে বাস্তবায়ন হতে পারে। সেই চেষ্টা করছি।
১১ ঘণ্টা আগে
জোরপূর্বক শ্রমে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশসহ আরও ৫৯টি দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার ৬০টি দেশ থেকে আমদানির উপর ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে
১৬ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বেড়েছে। আজ বুধবার এশিয়ার প্রাথমিক লেনদেনে অপরিশোধিত তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন
১৮ ঘণ্টা আগে