Ajker Patrika

‘জল জননীর আর্তনাদ’

ফুলজোড় তীরের মানুষের দুঃসহ জীবনের গল্প

আব্দুল্লাহ আল মারুফ, সিরাজগঞ্জ
ফুলজোড় তীরের মানুষের দুঃসহ জীবনের গল্প
ছবি: আজকের পত্রিকা

মাছচাষি চরিত্রের মধ্যবয়স্ক মানুষটি তখন মঞ্চ ছাড়ছেন। মাছ মারা যাওয়ায় একটু আগেও চাষি আর্তনাদ করলেন। দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন করছিলেন, ‘আমার সব মাছ মরে গেলে সংসার চলবে কীভাবে? ঋণ শোধ করব কী দিয়ে?’

নাটক শেষ হতেই হাততালিতে ভরে ওঠে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার শিমলা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ। সন্ধ্যা নেমে আসছে। শিমলা মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে শিল্পীরা গুছিয়ে নিচ্ছেন মাইক্রোফোন, পোশাক আর মঞ্চসামগ্রী। দর্শকেরাও ধীরে ধীরে ফিরছে বাড়ির পথে।

তবে আব্দুল সামাদের ফেরার তাড়া নেই। ৯০ বছরের কাছাকাছি বয়সী এই মানুষটি কিছুক্ষণ আগে নাটক দেখেছেন। এখন ধীরে ধীরে হাঁটছেন ফুলজোড় নদের দিকে। নিচুস্বরে বলেন, ‘নাটকে যা দেখাইল, এগুলা তো আমাদের জীবনের কথাই।’ একসময় ফুলজোড় নদই ছিল তাঁর ভরসা। মাছ ধরতেন। এটির পানি দিয়ে ধানের আবাদ করতেন।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে ফুলজোড় নদ ও নদীনির্ভর মানুষের জীবন নিয়ে শিমলা গ্রামে মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘জল জননীর আর্তনাদ’। বেসরকারি সংস্থা ‘নিজেরা করি’ এর আয়োজনে নাটকটি পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সম্মিলিত প্রয়াস’। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ১৮ জন শিল্পী অংশ নেন। নাটকের প্রশিক্ষক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী, থিয়েটার দল বটতলার কর্মী ও থিয়েটার অ্যাকটিভিস্ট কাজী রোকসানা রুমা।

নাটকে উঠে আসে মৃত মাছ, হারিয়ে যাওয়া হাঁস, ঋণে জর্জরিত কৃষক, দূষিত নদ-নদী, আর ভীষণ সংকটে পড়া মানুষের গল্প।

মঞ্চের চরিত্রগুলো কাল্পনিক। কিন্তু সেগুলো দর্শকসারিতে বসা অনেক মানুষের নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

একটি দৃশ্যে দেখা যায়, খামারের হাঁস হারিয়ে কান্না করছেন এক নারী। নাটক শেষে শিমলামধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মুনি খাতুন বলেন, ‘আমাদের এলাকাতেও অনেকের হাঁস মারা গেছে। তাই নাটক দেখে মনে হইছে, আমাদের গ্রামের কথাই শুনতেছি।’

ফুলজোড় নদের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শিমলাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পাশের বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কারখানার তরল বর্জ্যের দূষণে নদের মাছ, শামুক-ঝিনুকসহ নানা জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদকেন্দ্রিক জীবিকা।

খেয়াঘাটের পাশে চায়ের দোকানে কাজ করা কিশোর জিন্নাত শেখের শরীরে ঘায়ের দাগ। নদের দিকে আঙুল দেখিয়ে সে বলে, ‘আগে নদীতে গোসল করতাম। এখন আর নামি না। শরীরে ঘা হয়। আগে অনেক হাঁস ছিল, এখন মরে মরে শেষ।’

আরেক কিশোর তালহা শেখেরও অভিযোগ, নদে নামলে শরীর চুলকায়। সে বলে, গোসল করলেই চুলকানি শুরু হয়।

ফুলজোড় নদ রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থী ফয়সাল বিশ্বাস বলেন, ‘এই নদ রক্ষার আন্দোলনে নামায় আমাকে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলায় জড়িয়েছে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক দীপক কুমার কর বলেন, নদ রক্ষা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি সবার দায়িত্ব। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত