Ajker Patrika

রংপুর বিভাগ: অন্যদের দুর্বলতায় জামায়াতের উত্থান

  • ৩৩ আসনের ১৮টিতে জয় পেয়েছে জামায়াত জোট।
  • প্রার্থী দিতে দেরি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ছিল বিএনপিতে।
  • নেতৃত্বসংকটে স্থবির জাপা, মাঠে ছিলেন না নেতারা।
শিপুল ইসলাম, রংপুর 
রংপুর বিভাগ: অন্যদের দুর্বলতায় জামায়াতের উত্থান

রংপুর বিভাগে ৩৩ আসনের মধ্যে ১৬টিতে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির জোটসঙ্গী এনসিপি পেয়েছে আরও দুটি আসন। স্থানীয়রা বলছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটের স্বাভাবিক সমীকরণ ভেঙে গেছে। জামায়াতের এত আসন পাওয়ার পেছনে আরও দুটি বড় কারণ হলো জাতীয় পার্টির (জাপা) ভাঙন ও বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা।

রংপুরের ছয় আসনের পাঁচটিতে জামায়াত, একটিতে এনসিপি। গাইবান্ধার পাঁচটির চারটিতে জামায়াত, একটিতে বিএনপি। কুড়িগ্রামের চারটির তিনটিতে জামায়াত, একটিতে এনসিপি। নীলফামারীর চারটিতেই জামায়াত। অন্যদিকে পঞ্চগড়ের দুই আসনই পেয়েছে বিএনপি। ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটিতেও জয় পেয়েছে তারা। দিনাজপুরের ছয়টির পাঁচটিতে বিএনপি, একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।

রংপুর একসময় জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এর নেপথ্যে মূল কারণ ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর নেতৃত্বসংকট, মাঠপর্যায়ে স্থবিরতা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতায় দলটি দুর্বল হয়ে পড়ে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাপার রংপুরের এক নেতা বলেন, ‘এরশাদ সাহেবের পর আমরা আগের মতো সংগঠন ধরে রাখতে পারিনি। দল পুনর্গঠনের কাজই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’

এদিকে ভোটের মাঠেও ছিল জাপার সরব উপস্থিতি। দলীয় সূত্র বলছে, ভোটের দিন সকাল থেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে কোথাও দেখা যায়নি। মাঠে ছিলেন না জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারাও।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বর্তমান রংপুর বিভাগের মোট ৩৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২১টিতে জয়লাভ করে। বাকি ১২টি পায় জাতীয় পার্টি। তবে এবারের নির্বাচনে জাপার দুর্বলতা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি প্রতিদ্বন্দ্বিতার চরিত্র বদলে দেয়। স্কুলশিক্ষক আখতারুজ্জামান তুফান বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটের স্বাভাবিক সমীকরণ ভেঙে গেছে। তাদের একটি বড় অংশ বিকল্প শক্তির দিকে সরে যাওয়ায় ফলাফলে বড় প্রভাব পড়েছে।

এদিকে রংপুরে বিএনপির ভরাডুবির পেছনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বিলম্ব, নতুন মুখ, মনোনয়নবঞ্চিতদের ক্ষোভ, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মতো বিষয়গুলো সামনে আসছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘আমরা অনেক আসনে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। তবে কিছু সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা এবং ভোটের বাস্তবতায় ফল আমাদের পক্ষে আসেনি।’

অন্যদিকে জামায়াত প্রায় দেড় বছর আগে প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে নামে। ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ায়। নারী ও তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে। দীর্ঘদিনের শিক্ষা, সামাজিক ও দাতব্য কার্যক্রমও তাদের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘আমরা মানুষের জন্য কাজ করি। সংসদে গিয়ে তাদের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেব।’

কাউনিয়ার তরুণ ভোটার জাহিদুল ইসলাম জসিম বলেন, ‘যিনি এলাকায় থাকবেন এবং কাজ করবেন, তাঁকেই আমরা ভোট দিয়েছি। নতুন দেশ গড়ার জন্য, এবার আমরা নতুন নেতৃত্ব দেখতে চেয়েছি।’

১৯৯১ সালে সারা দেশে ১৮টি আসন পায় জামায়াত। ১৯৯৬ সালে এটি ৩টিতে নেমে আসে। ২০০১ সালে আবার এটি ১৭তে উন্নীত হয়। সেই প্রেক্ষাপটে এবার জোটগতভাবে সারা দেশে ৭৭টি এবং রংপুর বিভাগে ১৮টি আসন পাওয়া দলটির জন্য বড় পুনরুত্থান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ত্বহা হুসাইন বলেন, এবারের নির্বাচনে জামায়াতের উত্থান মূলত রাজনৈতিক শূন্যতার ফল। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং জাতীয় পার্টির মাঠপর্যায়ে কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে, জামায়াত সেটি কাজে লাগাতে পেরেছে। এ ছাড়া অনেকে প্রচলিত দলগুলোর বাইরে গিয়ে বিকল্প খুঁজেছেন। দীর্ঘদিন একই শক্তিকে দেখার পর নতুন কাউকে পরখ করে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। সেটিও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত