Ajker Patrika

শতভাগ ফেলের দায় সিসি ক্যামেরার ওপর চাপালেন শিক্ষক

শিপুল ইসলাম, রংপুর 
শতভাগ ফেলের দায় সিসি ক্যামেরার ওপর চাপালেন শিক্ষক
কুমারপুর উচ্চবিদ্যালয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় ৫৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৯ জন পাস করেছিল। এক বছরের ব্যবধানে এ বছর সেই বিদ্যালয়ের ১৮ পরীক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফলাফল নেমে এসেছে শূন্যে। এর কারণ হিসেবে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, সিসি ক্যামেরার ভয়ে শিক্ষার্থীরা এমন ফল করেছে। আরও এক শিক্ষক দায় চাপালেন অভিভাবকদের অসচেতনতা ও সিসি ক্যামেরার ওপর।

ঘটনাটি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতড়া ইউনিয়নের কুমারপুর উচ্চবিদ্যালয়ের। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে ১৮ জন অংশ নিলেও সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। অথচ বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৯ জন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারী রয়েছেন। এক বছরের ব্যবধানে ফলাফলের এমন পতনে বিদ্যালয়ের পাঠদান ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যালয়টি। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৫৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ২৯ জন পাস করেছিল। অর্থাৎ, গত বছর অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলেও এবার একজনও পাস করেনি।

আজ সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষক কহিনুর বেগমকে পাওয়া যায়নি। কয়েকজন শিক্ষককে অফিসকক্ষে বসে থাকতে দেখা যায়। শ্রেণিকক্ষগুলোতে ছিল ১৫-১৬ জন শিক্ষার্থী।

প্রধান শিক্ষক কহিনুর বেগমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল খালেক বলেন, ‘এবার আমাদের বাচ্চারা একটু ভীতু ছিল। সিসি ক্যামেরা ছিল, ভয়ে শিক্ষার্থীরা এমন ফল করেছে। আশা রাখি, আগামী দিনে ভালো করবে।’

আরও এক সহকারী শিক্ষক মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এটা প্রত্যন্ত অঞ্চল, সে কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা অসচেতন। তার ওপর সিসি ক্যামেরার ভয়ে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পরীক্ষা ভালো দিতে পারেনি। এটাই হচ্ছে মূলত তাদের ফেল করার কারণ। ইতিপূর্বে কোনো সমস্যা ছিল না। তারা সুন্দরভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পরীক্ষা দিয়েছে, পরীক্ষায় পাসও আছে।’

স্থানীয় যুবক সবুজ মিয়া বলেন, ‘৯ জন শিক্ষক থাকার পরও ১৮ জন পরীক্ষার্থীর একজনও পাস না করার কারণ কী? শিক্ষার্থীদের পাঠদানে কোথাও ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। আমরা চাই, কারও গাফিলতির কারণে বিদ্যালয়টি যেন ধ্বংস হয়ে না যায়।’

ঘাষিপুর উচ্চবিদ্যালয়। ছবি: আজকের পত্রিকা
ঘাষিপুর উচ্চবিদ্যালয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

পাশের স্কুলেও শূন্য

একই ইউনিয়নে কুমারপুর উচ্চবিদ্যালয়ের পাশেই ঘাষিপুর উচ্চবিদ্যালয়। সেখানেও এবার এসএসসিতে শূন্য ফল। ২০২৬ সালে বিদ্যালয়টি থেকে ১৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে কেউই পাস করতে পারেনি। অথচ ২০২৫ সালে ২০ জনের মধ্যে ১১ জন উত্তীর্ণ হয়েছিল।

২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঘাষিপুর উচ্চবিদ্যালয় ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চারজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষক-সংকটের কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।

বেলা ৩টার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে ছয় থেকে সাতজন শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে দেখা যায়। শিক্ষকেরা ছিলেন অফিসকক্ষে। সব পরীক্ষার্থী ফেল করার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজার রহমান আজকের পত্রিকার পীরগঞ্জ প্রতিনিধির ওপর চড়াও হন। পরে তিনি মোবাইল ফোনে বলেন, ‘এবার শিক্ষার্থীরা একটু দুর্বল ছিল। আগামী দিনে আমরা ভালো করব। আমার নতুন এমপিওভুক্ত স্কুল, মাত্র চারজন শিক্ষক। এটা একটা বড় সমস্যা। এ কারণে স্কুলটা জরাজীর্ণ।’

স্থানীয় রোস্তম আলী মিয়া বলেন, জনসচেতনতার অভাবে এমন হতে পারে। এলাকার অভিভাবকেরা সচেতন হলে শূন্য ফল হতো না।

মিলন নামের আরও এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘শূন্য ফলের জন্য শিক্ষকেরাও দায়ী। শিক্ষকেরা পাঠদানে সচেতন হলে প্রতিষ্ঠান দুটিতে এমন হতো না। আমরা চাই, স্কুলগুলোতে ভালো পাঠদানের পরিবেশ ফিরে আসুক।’

দুটি বিদ্যালয়ের ফলাফল সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা, অভিভাবকদের অসচেতনতা কিংবা সিসি ক্যামেরা নিয়ে। এসব কি শূন্য ফলের কারণ, না এর পেছনে রয়েছে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তার ঘাটতি? বিশেষ করে, ৯ জন শিক্ষক থাকা কুমারপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ১৮ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করায় বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পীরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, ‘যে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শোকজ করা হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত লিখে পাঠাব, যেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’

এদিকে তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের বটতলী নমিরুল দাখিল মাদ্রাসাতেও এবার পাঁচ পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি। প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাদ্রাসাটিতে ১৪ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় হয় বলে জানা গেছে।

তারাগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম বলেন, বিধিমোতাবেক ওই মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত