Ajker Patrika

মাদ্রাসার জমি বন্ধক দিয়ে অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

আব্দুর রহিম পায়েল, গঙ্গাচড়া (রংপুর) 
মাদ্রাসার জমি বন্ধক দিয়ে অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে
অভিযুক্ত বিএনপি নেতা মো. শহীদুল ইসলাম মুন্সি ও মাহমুদুল ইসলাম সবুজ। ছবি: সংগৃহীত

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার জমি বন্ধক দিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসী গত ৯ এপ্রিল জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ঘটনা তদন্তে গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাহফুজার রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন।

অভিযুক্ত ওই বিএনপি নেতার নাম মো. শহীদুল ইসলাম মুন্সি। তিনি বেতগাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও বেতগাড়ী একরামিয়া বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার সভাপতি। একই সঙ্গে ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মাহমুদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধেও মাদ্রাসার ১৮ শতক জমি জোরপূর্বক ভোগদখলের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে শহীদুল ইসলাম মাদ্রাসা পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, বিভিন্ন তহবিলের অর্থ এবং প্রতিষ্ঠানের জমি বন্ধক দিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বেতগাড়ী তহশিল অফিসের তথ্যানুযায়ী, বেতগাড়ী মৌজার ৭ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ৫৪৪, ৫৪৮, ৫৫০, ৬৫৪, ৬৫৫, ৬৫৬, ৬৫৭, ৮০১, ৮০২, ১৬২২, ১৯৫৮, ২০০৬, ২০৫১, ২০৬৩ ও ২১৩০ নম্বর দাগের জমিগুলো মাদ্রাসার মালিকানাধীন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব দাগের প্রায় ১৬ বিঘা জমি বন্ধক দিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

একই অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই মৌজার ১০৫৮ নম্বর দাগের ১৮ শতক জমি ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মাহমুদুল ইসলাম সবুজ জোরপূর্বক ভোগদখল করে আছেন।

জানা গেছে, গত ১ জুন জারি করা নোটিশে বাদী-বিবাদীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ৯ জুন সরেজমিন তদন্তে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সাক্ষীসহ উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তদন্তের নির্ধারিত তারিখের আগে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মনোয়ারুল ইসলাম অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তদন্ত এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে প্রায় দুই মাস শয্যাশায়ী থাকায় তদন্তে সহযোগিতা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। পরে গত আগস্টের ৯ তারিখ নতুন তারিখে তদন্ত কমিটি সরেজমিনে গিয়ে বাদী, বিবাদী, সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে।

তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ২৩ মার্চ ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়। ওই প্রতিবেদনে মাদ্রাসার নিজস্ব জমির পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৭ একর, অর্থাৎ স্থানীয় হিসেবে প্রায় ১৯ বিঘা উল্লেখ রয়েছে।

ওই সব জমিতে চাষাবাদ করা কয়েকজন ব্যক্তি জানান, তাঁরা জমির ধরনভেদে ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে জমিগুলো বন্ধক নিয়ে আবাদ করছেন।

এ বিষয়ে বাচ্চা মিয়া বলেন, ‘আমি প্রায় ২৪ শতক জমি দীর্ঘদিন ধরে বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করছি। প্রতি বছর মাদ্রাসায় টাকা দিই।’ টাকার রসিদ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁকে কোনো রসিদ দেওয়া হয় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। তাঁদের আশঙ্কা, পরিচয় প্রকাশ হলে বন্ধকের টাকা ফেরত পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। তবে তাঁরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের দাবি জানান।

মাদ্রাসাটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মনোয়ারুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি তিন মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছি। দায়িত্ব গ্রহণের সময় জমি-সংক্রান্ত কোনো নথি আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। চূড়ান্ত কমিটি না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারছি না। যাঁরা জমি আবাদ করেন, তাঁরা মাদ্রাসায় টাকা জমা দেন। সেই অর্থ গ্রহণের রসিদও রয়েছে।’ তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো রসিদ বা নথি দেখাতে পারেননি।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের জমি ও আর্থিক লেনদেন-সংক্রান্ত নথি রয়েছে। তবে সেগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে।

জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মাহমুদুল ইসলাম সবুজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ দিকে অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা শহীদুল ইসলাম মুন্সি বলেন, ‘মাদ্রাসার কোনো জমি বন্ধক দেওয়া হয়নি। সব জমি নিয়মানুযায়ী বর্গা দেওয়া হয়েছে এবং প্রতি বছর প্রাপ্ত অর্থ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা হয়। ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘তথ্য-প্রমাণ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করা হলে আমি আইনি ব্যবস্থা নেব।’

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাহফুজার রহমান বলেন, ‘বাদী, বিবাদী, সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। আরও কিছু দাপ্তরিক নথি সংগ্রহের পর তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হবে।’

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমীন আক্তার বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় কিছু নথি তাঁদের দেওয়া হয়নি। তাই প্রাপ্ত তথ্য ও নথির ভিত্তিতেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত