Ajker Patrika

আদিবাসী সাক্ষরতা দিবস: বাধা পেরিয়ে মূলধারায় পাহাড়ের তরুণেরা

হিমেল চাকমা, রাঙামাটি 
আদিবাসী সাক্ষরতা দিবস: বাধা পেরিয়ে মূলধারায়
পাহাড়ের তরুণেরা
দুর পাহাড়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা। সম্প্রতি রাঙামাটি সদরের বড়ধাম এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

পাহাড়ি জনপদে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পেয়েও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা ধীরে ধীরে দেশের মূলধারায় যুক্ত হচ্ছেন। মেধা, ধৈর্য এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন তাঁরা। সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাড়ছে সাক্ষরতার হার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ষষ্ঠ জনশুমারি এবং গৃহগণনায় উঠে এসেছে এই চিত্র।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, রাঙামাটি জেলার সার্বিক সাক্ষরতার হার ৭১ দশমিক ৪১ শতাংশ। জেলার আদিবাসীদের গড় সাক্ষরতার হার ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ। তাদের মধ্যে চাকমাদের শিক্ষার হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, পাংখো, বম, লুসাই ও খিয়াং জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার এখনো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে।

খাগড়াছড়ির সার্বিক সাক্ষরতার হার ৭১ দশমিক ৮০ শতাংশ। আদিবাসীদের গড় সাক্ষরতার হার ৫৪ থেকে ৫৮ শতাংশ। এ ছাড়া চাকমা ও মারমাদের সাক্ষরতার হার প্রায় ৭০ শতাংশ হলেও ত্রিপুরা ও অন্যান্য ছোট নৃগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ।

বান্দরবানে সার্বিক সাক্ষরতার হার ৫২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আদিবাসীদের মধ্যে এই হার আরও কম, ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ। থানচি, রুমা ও আলীকদমের দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী ম্রো ও খুমি জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার এখনো ৩০ শতাংশের নিচে।

২০১১ সালের পঞ্চম জনশুমারি অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সার্বিক গড় সাক্ষরতার হার ছিল ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। সে সময় চাকমাদের শিক্ষার হার ছিল ৭৩ শতাংশ। অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর গড় শিক্ষার হার ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ। দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী ম্রো ও বম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ।

শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাহাড়ি তরুণদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। সরকারি একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) বিভিন্ন ক্যাডারে বর্তমানে প্রায় ২০০ আদিবাসী কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। তাঁদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে প্রায় ৬১ জন, স্বাস্থ্য ক্যাডারে ৬৬ জন, পুলিশে ৩৩ জন, শিক্ষা ক্যাডারে ৩০ জন এবং কৃষি ক্যাডারে চারজন রয়েছেন। সিভিল সার্ভিসের অন্যান্য স্তরেও দায়িত্ব পালন করছেন পাহাড়ের তরুণেরা।

শুধু সরকারি চাকরি নয়, দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, সেনাবাহিনী, ব্যাংক, নন-ক্যাডার পদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থায়ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগের সংকট এবং দুর্গম পথ পেরিয়ে যাঁরা শিক্ষার আলোয় এসেছেন, তাঁদের অনেকে এখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন।

অগ্রযাত্রায় শঙ্কা

মানবাধিকারকর্মী সুস্মিতা চাকমা বলেন, এই অর্জনের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল হওয়ায় অনগ্রসর অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। ভৌগোলিক সামাজিক অর্থনৈতিক পিছিয়ে পড়ার কারণে অসম প্রতিযোগিতায় অনেকে পিছিয়ে পড়ছেন।

এর সঙ্গে পাহাড়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতাও শিক্ষার্থীদের অগ্রযাত্রায় বাধা তৈরি করছে। সংঘাতের কারণে কোনো কোনো পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবককে হারাচ্ছে। এতে অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণীর শিক্ষাজীবনও অকালে থেমে যাচ্ছে। এটি রাষ্ট্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রয়োজন বিশেষ সহায়তা

কৃষিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক পবন কুমার চাকমা বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা যতটা এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, ততটা পারেননি। তবে নানা প্রতিকূলতা জয় করে তাঁরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

পবন কুমার বলেন, দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তাদের অনগ্রসরতা বিবেচনায় সরকারি চাকরিতে সহায়ক নীতি বা কোটা সুবিধা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা গেলে শুধু ২০০ জন নয়, হাজার হাজার পাহাড়ি তরুণ নিজেদের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত