Ajker Patrika

আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর: সম্ভাবনার প্রকল্পে অবহেলা

  • গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির জন্য গড়ে তোলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি
  • উদ্বোধনের চার বছর পরও গতিহীন ইনকিউবেটর। নেই কোনো প্রতিষ্ঠান
  • ২৫ কোটি টাকার ইনকিউবেটরের পুরো কর্তৃত্ব চায় চুয়েট কর্তৃপক্ষ
সবুর শুভ, চট্টগ্রাম    
আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর: সম্ভাবনার প্রকল্পে অবহেলা
ফাইল ছবি

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক তৈরি, শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে দক্ষ করে তোলাসহ নানা লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত এই ইনকিউবেটর উদ্বোধন করা হয়েছে চার বছর আগে। কিন্তু নেই কোনো কার্যক্রম। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ বিভিন্ন বিষয়ে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নে চুয়েটের ভেতরে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান। ৪ দশমিক ৭ একর জমিতে দেশের প্রথম ক্যাম্পাসভিত্তিক আইটি বিজনেস ইনকিউবেটরটি গড়ে তোলা হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক তৈরি করা, শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে দক্ষ করে তোলা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করাসহ নানা লক্ষ্য নিয়ে এটি তৈরি করা হয়। এই ভবনে আছে ২৭টি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনার ব্যবস্থা। আর প্রতি বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ নিতে খরচ মাত্র ১০ টাকা।

ইনকিউবেশন ভবনটি ১০ তলার। আলিশান এই ভবনের প্রতিটি ফ্লোর পাঁচ হাজার বর্গফুট। এই ভবনের পাশেই নারী ও পুরুষদের জন্য রয়েছে পৃথক দুটি ডরমিটরি। চারতলাবিশিষ্ট প্রতিটি ডরমিটরিতে ৪০টি কক্ষ আছে। একটি ডরমিটরির আয়তন ২০ হাজার বর্গফুট। আরও আছে ছয়তলা মাল্টিপারপাস প্রশিক্ষণ ভবন, যার প্রতিটি ফ্লোর ৬ হাজার বর্গফুট। স্টার্টআপ জোন, আইডিয়া বা ইনোভেশন জোন, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিক কোলাবোরেশন জোন, ব্রেনস্টর্মিং জোন, ই-লাইব্রেরি, ডেটা সেন্টার, রিসার্চ ল্যাব, কর্নার, প্রদর্শনী সেন্টার, ভিডিও কনফারেন্স কক্ষ ও সভাকক্ষ এবং আটটি কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে ভবনের ভেতর।

এ ছাড়া রয়েছে ব্যাংক ও আইটি ফার্মের জন্য পৃথক কর্নার, অত্যাধুনিক সাইবার ক্যাফে, ফুড কোর্ট, ক্যাফেটেরিয়া, রিক্রিয়েশন জোন, মেকার স্পেস, মিডিয়া কাভারেজ জোন ও নিজস্ব পার্কিং সুবিধা।

ইনকিউবেটরে ৩৬০টি এসি, ২২৫টি কম্পিউটার, ১০ জিবিপিএস ইন্টারনেট, চারটি লিফট, সোলার প্যানেল, সিসিটিভি সিস্টেমসহ সবকিছুই আছে। দুই হাজার কিলোওয়াটের সাবস্টেশন ও ৫০০ কিলোওয়াটের ডিজেল জেনারেটর রয়েছে। ল্যাবগুলোতে থাকা ২২৫টি কম্পিউটারের জন্য নেই কোনো টেকনিশিয়ান বা ল্যাব সহকারী। ফলে এগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে। নিরাপত্তার জন্য আছেন মাত্র একজন কর্মী।

বর্তমানে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও গ্যাস বিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ খরচ প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ টাকা। সেই হিসাবে উদ্বোধনের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন হয়। এ সময় প্রকল্প ব্যয় ছিল ৮২ কোটি ২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে সংশোধন করে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর ২০২২ সালের ৬ জুলাই প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। তবে চূড়ান্ত ব্যয় (হস্তান্তর পর্যন্ত) হয় প্রায় ১২৫ কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইনকিউবেটরের ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সংস্থানসহ সামগ্রিক সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিনকার কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ক্ষেত্রে শুধু জনবল সরবরাহ করে চুয়েট কর্তৃপক্ষ। জনবলের বেতন-ভাতাও দেয় হাই-টেক পার্ক। সব কাজ সমন্বয় করার জন্য কোনো একক কর্তৃপক্ষ নেই। অথচ প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার পর এটি চুয়েট কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো তা হয়নি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক ও টেলিকমিউনিকেশনস বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, এই ইনকিউবেটর থেকে শিক্ষার্থীরা যে সুফল পাওয়ার কথা ছিল, তা পাওয়া যাচ্ছে না। এত বড় প্রকল্পকে কীভাবে দ্রুত কাজে লাগানো যায়, তা সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে ভাবতে হবে।

গত ৩১ আগস্ট সরেজমিনে দেখা গেছে, ইনকিউবেটরে ঢোকার গেট খোলা থাকলেও ভবনের দরজা তালাবদ্ধ। ওই ভবনের এক কর্মী তালা খুলে দেন। প্রতি তলায় চেয়ার, আলিশান লাইটিং, ফ্যান, এসি, সোফা ও টেবিল বসানো। ব্যবহার না হওয়ায় এসব আসবাবে ধুলো-ময়লা জমেছে। আশপাশে থাকা ডরমিটরিগুলোর প্রায় সব কামরাও তালাবদ্ধ।

এদিকে, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে, ইনকিউবেটরে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৬ হাজার ৩৭৯ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২টি কোম্পানি প্রথম দিকে কাজ শুরু করেছিল। কোম্পানিগুলো হচ্ছে রকওন আইটি গ্লোবাল ও চালডাল লিমিটেড। কিন্তু ৩১ আগস্ট সরেজমিনে প্রতিষ্ঠান দুটি অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে রকওন আইটি গ্লোবালের স্বত্বাধিকারী ইঞ্জিনিয়ার সুভ্রকার দেব বলেন, ‘আমরা স্পেস বরাদ্দ নিয়েছিলাম। নানা অসুবিধার কারণে সেখান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।’

চুয়েট কর্তৃপক্ষ এককভাবে এটি পরিচালনা করতে পারলে এই প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব বলে জানান চুয়েটের উপাচার্য প্রফেসর ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। তিনি বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান চালানোর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বেতন-ভাতাসহ আরও কয়েকটি বিষয় এখনো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে। এটি পুরোপুরি চুয়েটের আওতায় এলে সফলতা আসতে পারে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের উপসহকারী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) শেখ মেহেদী হাসান বলেন, ‘ইনকিউবেটরকে সফলভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি একটি “পারফরম্যান্স অডিট” দল চুয়েটে যায়। দলটি প্রকল্পের তথ্য-উপাত্ত, বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে। আমরা সেই প্রতিবেদনের আলোকেই অগ্রসর হব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত