Ajker Patrika

সৌদিতে অগ্নিকাণ্ড: স্বপ্ন ফিরল কফিনবন্দী হয়ে

• সাত বাংলাদেশির মরদেহ গতকাল শনিবার সকালে দেশে পৌঁছায়

• মৃতদের মধ্যে নওগাঁর পাঁচজন এবং নাটোরের দুইজন রয়েছেন

সুমন আলী, নওগাঁ ও রানা আহমেদ, নলডাঙ্গা (নাটোর)
সৌদিতে অগ্নিকাণ্ড: স্বপ্ন ফিরল কফিনবন্দী হয়ে
ছেলে মিনহাজ প্রামাণিকের কফিন ধরে কাঁদছেন মা। গতকাল বিকেলে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘তিন মাস আগেই তো হামার ছাওয়াল অনেক আশা করে, সমিতত থ্যাকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে বিদেশ গেছিল। বিদেশ যাইয়ে কামও পাইছিল। কিন্তু সর্বনাশা আগুনে হামার সব শ্যাষ হয়ে গেল। বুকের ধনটা হামাক রেখে চলে গ্যালো। কিসের আশায়, ক্যামন করে হামরা বাঁচমু? শাহিনের তো দুটা ছোট ছোট সন্তান আছে, এতিম ওগুলা কী খাইবে, তাদেরও বা কী হবে? আর মাথার ওপর এই ঋণের পাহাড়ই বা আমরা কীভাবে শোধ করমু?’

সৌদি আরবে সোফা কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া শাহিনের মরদেহ গতকাল শনিবার বিকেলে নওগাঁর বাড়িতে পৌঁছালে তাঁর মা নার্গিস বেগম আহাজারি করে এসব কথা বলছিলেন।

সৌদি আরবে আগুনে প্রাণ হারানো সাত বাংলাদেশির মরদেহ গতকাল সকালে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এরপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেলে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহগুলো তাঁদের নিজ নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়। মৃতদের মধ্যে নওগাঁর পাঁচজন এবং নাটোরের দুইজন রয়েছেন।

নওগাঁর নিহত পাঁচ প্রবাসী হলেন নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর

গ্রামের সাগর আলী। নাটোরের নিহত দুই প্রবাসী হলেন মোহাম্মদ শামীম ও সাব্বির হোসেন।

অভাব-অনটনের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ভিটেমাটি বন্ধক রেখে ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন এই প্রবাসীরা। স্বজনদের চোখে ছিল সচ্ছলতার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন কফিনে ফিরল। আর তাঁদের স্বজনদের কাঁধে চেপে বসেছে চড়া সুদের দেনা।

নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি বলেন, ‘ছেলের লাশটা বুকে জড়াইয়া মনে হইলো, আমার বুকের ভেতরটাও চিরতরে ফাইটা চৌচির হইয়া গেছে।’

নিহত মাসিদুলের বাবা মজনু সরদার বলেন, ‘জীবনের এই শেষ বয়সে এসে এত বড় শোক সহ্য করার শক্তি আমার আর নেই।’

নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন বলেন, ‘ঋণের একটা টাকাও শোধ করতে পারলাম না। বাচ্চা দুইটাকে নিয়া এই শূন্য হাতে আমি এখন কার কাছে গিয়ে দাঁড়াব?’

সরকারি সহায়তার বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিহতদের মরদেহ দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে আপাতত ৩৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে সরকারি অনুদান দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করতে স্থানীয় প্রশাসন তৎপর রয়েছে।

নলডাঙ্গায় দুই প্রবাসীর দাফন

নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দুই প্রবাসী মোহাম্মদ শামীম ও সাব্বির হোসেনের মরদেহ গতকাল তাঁদের নিজ বাড়িতে নেওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। এদিন বেলা ৩টার দিকে নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘিরপাড় গ্রামে শামীম এবং খাজুরা গ্রামে সাব্বিরের মরদেহ নেওয়া হয়। জানাজা শেষে দুজনের মরদেহ খাজুরা কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম হোসেন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের দাফনের যাবতীয় ব্যয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া

হবে। এই দুই পরিবারের আর কোনো দাবি থাকলে, তাদের সহায়তা দেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত