Ajker Patrika

রামেক হাসপাতাল

পাঁচবার বের করা হয়েছিল দূষিত রক্তরস, এবার মা হলেন সেই নারী

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
পাঁচবার বের করা হয়েছিল দূষিত রক্তরস, এবার মা হলেন সেই নারী
ফাইল ছবি

তানিয়া খাতুন অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন, কিন্তু মুখে হাসি নেই। জড়সড় হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামালের সামনে গিয়ে বললেন, ‘স্যার, একটা সমস্যা হয়েছে।’ এ কথা শুনেই মোস্তফা কামাল বুঝলেন—বিরল মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিসে আক্রান্ত তানিয়া মা হতে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চিকিৎসক বললেন, ‘আল্লাহ ভরসা।’ গর্ভধারণের প্রথম মাসেই চিকিৎসক আবু হেনা মোস্তফা কামালকে জানানোর পর সন্তান প্রসব পর্যন্ত তানিয়া তাঁর পর্যবেক্ষণেই থেকেছেন। ৩ মে এই হাসপাতালেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তানিয়া একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। খুশিতে আপ্লুত তানিয়ার স্বামী জেবর আলী তখন চিকিৎসকদের প্রতি শুধু কৃতজ্ঞতাই জানিয়ে গিয়েছিলেন।

আজ মঙ্গলবার জেবর আলী আবারও আইসিইউতে হাজির হলেন দুই হাতে ব্যাগ নিয়ে। তাতে চার প্যাকেট মিষ্টি, এক ছড়ি কলা, কিছু লিচু আর দুটি ডাব। এসব দেখে আবু হেনা মোস্তফা কামাল বললেন, ‘তুমি এসব করতে গেছ কেন? তোমাকে নিষেধ করেছি না?’ কোনো কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন কৃষক জেবর আলী। শুধু বললেন, ‘শুধু মিষ্টিটাই কিনেছি স্যার। বাকিগুলা গাছের।’

তখনই কথা হয় জেবর আলীর সঙ্গে। বললেন, ‘আমার পরিবার, রক্তের বাইরে যদি ভালোবাসার কোনো লোক থাকে, তাহলে তিনি এই স্যার। স্যার আমার কাছের মানুষ। স্যার আমার এলাকায় থাকলে সাত দিনে একবার দেখা করতে পারলেও ভালো লাগত। মাসে একবার হলেও দেখা করতাম। দূরে বলে পারি না।’ কেন আসেন—জানতে চাইলে বললেন, ‘এমনিতেই আসি।’

কথা বলে জানা গেল, জেবর আলীর বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার পলাশবাড়ী গ্রামে। তানিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ১০ বছর আগে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হঠাৎ একদিন তানিয়ার চোখ লাল হয়ে যায়। জেবর আলী বাজার থেকে একটি ড্রপ এনে দেন। সেটি দেওয়ার পর তানিয়ার চোখের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। সামনে থাকা যেকোনো জিনিস দুটি করে দেখতে শুরু করেন তিনি। জেবর আলী ভেবেছিলেন, স্ত্রীকে জিনে ধরেছে। কবিরাজ ডাকলেন। কবিরাজ এসে বললেন, এটি তাঁর কাজ নয়। দ্রুতই যেন তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন ভোরেই তাঁকে নেওয়া হয় পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখান থেকে চিকিৎসক দ্রুতই তাঁকে রামেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। এই হাসপাতালে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন, তানিয়া বিরল ‘মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস’-এ আক্রান্ত। রোগ শনাক্তের পর ২১ দিন আইসিইউসহ প্রায় আড়াই মাস হাসপাতালে ছিলেন তানিয়া। যেদিন হাসপাতাল ছাড়েন, সেদিন চিকিৎসকেরা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—মা হওয়া হবে তাঁর জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বাচ্চার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস শরীরের একটি বিরল ও দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন স্নায়বিক রোগ। শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা যখন ভুলবশত স্নায়ু ও পেশির সংযোগস্থলে আক্রমণ করে, তখন এই রোগ হয়। এর ফলে মস্তিষ্ক থেকে আসা সংকেত পেশি পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা পায় এবং পেশিগুলো চরম দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

তানিয়াকে সুস্থ করে তুলতে রামেক হাসপাতালের আইসিইউতে তাঁর পাঁচবার দূষিত রক্তরস বের করা হয়। তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি। তাঁর জন্য প্রয়োজন ছিল ইমিউনোগ্লোব্যুলিন। দাম ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা। জেবর আলীর পক্ষে এমন দামি ওষুধের টাকা জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তখন নিউরো মেডিসিনের অধ্যাপক কফিলউদ্দিন ও মেডিসিনের অধ্যাপক আজিজুল হক আজাদের সঙ্গে পরামর্শ করে রোগীর স্বজনদের রাজি করানো হয় যে, তানিয়ার শরীরের সমস্ত দূষিত রক্তরস বের করে নতুন করে দেওয়া হবে। এরপর এক দিন পরপর পাঁচ দিন তাঁর শরীরের দূষিত রক্তরস বের করে নতুন করে দেওয়া হয়। ১০ দিন পর তাঁর লাইফ সাপোর্ট খোলা হয়। ২১ দিন পর তাঁকে আইসিইউ থেকে নিউরো ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। এই রোগের এমন চিকিৎসা রাজশাহীতে তানিয়ার ক্ষেত্রেই প্রথম। ২০২৩ সালে হাসপাতাল ছাড়ার পরও প্রায়ই স্ত্রী তানিয়াকে নিয়ে আইসিইউতে চিকিৎসক আবু হেনা মোস্তফা কামালের সঙ্গে দেখা করতে আসেন কৃষক জেবর আলী।

জেবর আলী জানান, হাসপাতাল ছাড়ার সময় চিকিৎসকেরা বলেছিলেন—মা হওয়া তাঁর স্ত্রীর জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বাচ্চার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ভুলবশত তাঁর স্ত্রী গর্ভবতী হলে তাঁরা ভেঙে পড়েন। অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন গর্ভপাত করানোর জন্য। কিন্তু ভ্রুণ হত্যায় তাঁদের মন সায় দেয়নি। তাই আসেন চিকিৎসক আবু হেনা মোস্তফা কামালের কাছে। তারপর পরবর্তী সময় তাঁর তত্ত্বাবধানেই তানিয়া থেকেছেন। তিনি নিজে ওষুধ লিখে দিয়েছেন। কখনো কখনো গাইনি চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়েছেন। সেখান থেকে এসে আবার আবু হেনা মোস্তফা কামালকে ব্যবস্থাপত্র দেখিয়েছেন। এভাবেই পুরোটা সময় কেটেছে। কিন্তু বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় যত বাড়ছিল, তাঁদের উদ্বেগও তত বাড়ছিল। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম আসত না চোখে।

জেবর আলী জানান, ৩ মে এই হাসপাতালেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী সন্তান জন্ম দেন। এখন তাঁর স্ত্রী সুস্থ, বাচ্চাও ভালো আছে। খুশি হয়ে হাসপাতালে মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। তিনি এখনো বাচ্চার নাম রাখেননি। আবু হেনা মোস্তফা কামালের কাছেই বাচ্চার নাম চাইবেন। জেবর আলীর আরেকটি মেয়ে আছে। তার বয়স এখন আট বছর।

আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, লাইফ সাপোর্ট থেকে এসে কেউ আবার মা হয়েছেন—এমন ঘটনা রাজশাহীতে বিরল। তানিয়ার ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। হাসপাতালের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক রোকেয়া খাতুনের নেতৃত্বে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তানিয়া সন্তান জন্ম দেন। এটি হাসপাতালের গাইনি, অ্যানেসথেসিয়া, মেডিসিন, নিউরোলজি ও আইসিইউ বিভাগের দলগত সফলতা। তানিয়া আর তাঁর বাচ্চা এখন সুস্থ আছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

অস্ট্রেলিয়ায় স্ত্রী ও দুই প্রতিবন্ধী সন্তানকে হত্যা করে পুলিশে খবর দিলেন বাংলাদেশি

শিক্ষার্থীর বাসায় মিলল গৃহশিক্ষিকার বস্তাবন্দী মরদেহ

চিকিৎসক দম্পতির সন্তানের মৃত্যু: ‘কল দিয়ে ডাক্তার আশীষ স্যারের পা ধরেছি, তাও তিনি আসবেন না’

সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষিকার মৃত্যুর খবর শুনে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বিচারাধীন মামলার দ্রুততম নিষ্পত্তি: প্রধানমন্ত্রী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত