Ajker Patrika

বগুড়ায় মোহন হত্যা: নেতাদের চাপে বাদী হয়ে উল্টো আসামি হলেন শম্ভু

শাপলা খন্দকার, বগুড়া
আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২: ১২
বগুড়ায় মোহন হত্যা: নেতাদের চাপে বাদী হয়ে উল্টো আসামি হলেন শম্ভু

বগুড়ায় প্রকাশ্যে দিবালোকে যুবদল নেতা মোহনকে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর আতাউর রহমান শম্ভু নামে আরেক যুবদল নেতা বাদী হয়ে সদর থানায় মামলা করেন। কিন্তু পুলিশের তদন্তে পাল্টে যায় মামলার চিত্র। পরবর্তীতে মামলার বাদী শম্ভুকেই আসামি করে মামলা করে পুলিশ। এরপর কেটে গেছে ১৫ বছর, শুরু হয়নি বিচার। বর্তমানে মামলাটি বগুড়ার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-৩-এ ঝুলে আছে। 

আতাউর রহমান শম্ভু এখন দাবি করছেন, বিএনপির তৎকালীন জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মামলা করিয়েছে। মোহন হত্যার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। 

নিহত আতিকুর শেখ মোহন বগুড়া শহরের ১নং ওয়ার্ড যুবদলের আঞ্চলিক কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। আর আতাউর রহমান শম্ভু ছিলেন তৎকালীন শহর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। শম্ভু বর্তমানে জেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। 

জানা যায়, ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর ছিল ১৪ দলীয় জোট আওয়ামী লীগের দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি। এর পাল্টা কর্মসূচি পালন করে চারদলীয় (বিএনপি নেতৃত্বাধীন) ছাত্র ঐক্যজোট। এদিন দুপুরে বগুড়ায় সাতমাথা এলাকায় মোহনকে লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের পরদিন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ২১ জনের বিরুদ্ধে সদর থানায় হত্যা মামলা করেন তৎকালীন শহর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আতাউর রহমান শম্ভু। এর কয়েক দিন পর মোহনের মা অতিরিক্ত চারজনের নাম উল্লেখ আরেকটি অভিযোগ দেন।  মায়ের অভিযোগের পর মোহনের বাবাও আদালতে এজাহার দেন। 

যুবদল নেতা শম্ভুর এজাহার, মোহনের মায়ের অভিযোগ ও বাবার এজাহার একত্র করে মামলার তদন্ত শুরু করেন তৎকালীন জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) এসআই আব্দুল মান্নান। তদন্তে বেরিয়ে আসে, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আড়াল করতেই মামলা করেছেন শম্ভু। 

 ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআরটি-ফাইনাল রিপোর্ট ট্রুথ) দেন এসআই মান্নান। এই প্রতিবেদনে শম্ভুর মামলার সব আসামিকে নির্দোষ বলা হয়। একই দিন মামলার বাদী আতাউর রহমান শম্ভুসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন এসআই আব্দুল মান্নান। এই মামলায় মোহনের মা ও বাবার অভিযোগ থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়। 

ঘটনার দিন সাংবাদিকদের কিছু ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এ মামলা করেন এসআই আব্দুল মান্নান। 
 
এসআই আব্দুল মান্নানের করা মামলাটির তদন্তভার পান তৎকালীন জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক শাহিদুল ইসলাম শাহীন। তদন্ত শেষে ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর আদালতে ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তিনি। 

অভিযোগপত্রে থাকা ১৩ জন হলেন-বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক সাংসদ (শাজাহানপুর-গাবতলী) হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান পৌরমেয়র রেজাউল করিম বাদশা, ভিপি সাইফুল ইসলাম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন চান, জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি সিপার আল বখতিয়ার, খায়রুল বাশার, শাহ আলম, সোনা মিয়া, জেলহজ্ব ওরফে জুলহক, আতাউর রহমান শম্ভু, মিজানুর রহমান, জহুরুল ইসলাম, জাকিউল্লাহ আপেল। 

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মামলার অপর দুজন আসামি শাহাবুল ও রতনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। 

 ১৫ বছর পার হলেও শুরু হয়নি এই মামলার বিচার। এই সময়ের মধ্যে অভিযোগ গঠনের দিন পিছিয়েছে ৮৭ বার। সর্বশেষ শুনানি হয় চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে চলতি বছরের ১১ অক্টোবর। প্রথমে বিচারক সংকট এবং পরবর্তীতে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে থেমে আছে মামলার বিচার। 

মামলার ৮৬ তম শুনানির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মামলার ৮ নং আসামি ভিপি সাইফুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিচারের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন। হাইকোর্টের রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলার বিচারকার্য বর্তমানে স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-৩। 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোহন হত্যা মামলার আসামি জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি সিপার আল বখতিয়ার বলেন, ‘আমি এই মামলায় নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছি। আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলাটি করে পুলিশ। মোহন হত্যাকাণ্ডের পর যুবদল নেতা আতাউর রহমান শম্ভু ২১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। কিন্তু পুলিশ আমাদের বিরুদ্ধেই উল্টো আরেকটি মামলা করে। প্রথম মামলার বাদী শম্ভুকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করে তাঁকে দিয়ে আমাদের কয়েকজনের নাম বলিয়ে নেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল মান্নান।’ 

তবে মোহন হত্যা মামলার আসামি ও প্রথম মামলার বাদী জেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. আতাউর রহমান শম্ভু বলেন, ‘মোহন খুন হওয়ার পরে আমাকে দিয়ে হত্যা মামলা করান তৎকালীন জেলা বিএনপির নেতারা। অথচ আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিচ্ছু জানতাম না। আমি সেদিন ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে দলীয় কর্মসূচিতেই অংশ নিইনি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজেও জানি না কাদেরকে মামলার আসামি করা হয়েছিল। তৎকালীন জেলা বিএনপির নেতাদের কথা অনুযায়ী আমি শুধু মামলার এজাহারে স্বাক্ষর করেছিলাম। পরবর্তীতে পুলিশ একটি মামলা করে, সেই মামলায় আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আমি এখন নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছি মোহন হত্যাকাণ্ডের মামলায়।’ 

আতাউর রহমান শম্ভুর দাবি অনুযায়ী, তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা ও সাধারণ সম্পাদক ভিপি সাইফুল ইসলাম তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মামলার বাদী করিয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। 

শম্ভুর দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন তৎকালীন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভিপি সাইফুল। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শম্ভু যা বলছেন তা সত্য নয়। মামলা করার জন্য আমরা কাউকে জোর করিনি।’ 

বিচারের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে বগুড়া জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি আবদুল মতিন বলেন, প্রথমদিকে বিচারক সংকটের কারণে এই মামলার কাজ ব্যাহত হয়। তবে বর্তমানে মামলাটি অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-৩ এ স্থানান্তর করা হয়েছে। আসামিদের একজন হাইকোর্টে আবেদন করায় মামলাটি স্থগিত রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত