Ajker Patrika

এক উপজেলায় ৬ শতাধিক ‘মাংস সমিতি’, যুক্ত হয়েছেন সনাতনীরাও

বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি             
এক উপজেলায় ৬ শতাধিক ‘মাংস সমিতি’, যুক্ত হয়েছেন সনাতনীরাও
বাঘা উপজেলায় প্রায় ২০০টি গ্রামে প্রায় ৬ শতাধিক সমিতি গড়ে উঠেছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজশাহীর বাঘায় উপজেলায় সাধ আর সাধ্যের সমন্বয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ‘মাংস সমিতি’! অর্থাৎ সপ্তাহে কিংবা মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমার বদৌলতে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর প্রত্যেক সদস্যের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে ৩ থেকে ১০ কেজি করে গরু কিংবা খাসির মাংস। অন্যদিকে এই সমিতি এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে সনাতনী সম্প্রদায়ের লোকজনের অংশগ্রহণে। খাসির মাংসের জন্য তারাও যোগ হয়েছেন স্থানীয় এই সমিতিতে। ফলে ঈদের আনন্দ উৎসবে যোগ হয়েছে এক অন্যরকম সম্প্রীতি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্র জানিয়েছে, উপজেলায় প্রায় ২০০টি গ্রামে প্রায় ৬ শতাধিক সমিতি গড়ে উঠেছে। যেগুলোর মাধ্যমে অন্তত ৬০০টির বেশি গরু জবাই হয়েছে। যার বাজারমূল্য ছয় থেকে সাত কোটি টাকারও বেশি।

বাজারে গরুর মাংসের দাম যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, তখন অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে বছরের শেষে কম দামে মাংস পাওয়ার এই পদ্ধতি হয়ে উঠেছে অনেকের ভরসা। এমনই এক সমিতির সদস্য বাউসা ইউনিয়নের দিঘা গ্রামের দিনমজুর বাবর আলী বলেন, ‘সপ্তাহে ৫০ টাকা করে জমা দিয়েছিলাম। বছর শেষে প্রায় চার কেজি মাংস পেয়েছি। ঈদে পরিবার নিয়ে খেতে পারব—এটাই বড় আনন্দ।’

একই গ্রামের বিদা কফি শপের স্বত্বাধিকারী সুজন আলী জানান, বাজারে যেখানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা, সেখানে সমিতির মাধ্যমে অনেক কম দামে মাংস পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘৪০ জন মিলে সমিতি করেছি। কেউ ৪ কেজি, কেউ ৮ কেজি করে মাংস পেয়েছে।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে মাংসের উচ্চমূল্যের কারণে পরিবারগুলোর আমিষের চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধতা কাটাতেই এই উদ্যোগ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হিসেবেই গড়ে ওঠে ‘মাংস সমিতি’। সাধারণত ২০-৩০ জন মিলে গঠিত এসব সমিতির সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে ৫০ থেকে ১০০ টাকা জমা দেন। বছর শেষে সেই টাকায় গরু বা খাসি কিনে সদস্যদের মধ্যে মাংস ভাগ করে দেওয়া হয়।

প্রায় ছয়-সাত বছর ধরে চললেও গত এক-দুই বছর ধরে এসব সমিতিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। তারা মূলত খাসির মাংসের সমিতিতে যুক্ত হচ্ছেন। এতে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

আজ শুক্রবার সকালে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও গরু জবাই চলছে, কোথাও মাংস কাটাকাটি, আবার কোথাও ওজন করে সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। এসব ঘিরে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। সমিতির সদস্য রয়েছেন– প্রভাষক, ইজিবাইক চালক, সিএনজি চালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, মসজিদের ইমাম, সাংবাদিক, সরকারি কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতা।

উপজেলার দিঘা গ্রামের ইজিবাইক চালক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘দৈনিক আয় দিয়ে বাজার থেকে মাংস কেনা কঠিন। তাই মাসে ৫০০ টাকা জমা দিয়ে এবার প্রায় ৭ কেজি গরুর ও ১ কেজি খাসির মাংস পেয়েছি।”

দিঘা গ্রামের রিপন কুমার চৌধুরী বলেন, ‘গত বছর খাসির মাংসের সমিতিতে যুক্ত হয়ে ভালো অভিজ্ঞতা হয়েছে। এবারও সমিতি করেছি, অন্যরাও উৎসাহিত হয়েছে। তাদের মধ্যে উত্তম কুমার চৌধুরী, বিজয় দাস, সন্তোষ কুমার চৌধুরী, রতন কুমার ভৌমিক।’

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অন্তত ৬০০টির বেশি মাংস সমিতি সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি সমিতির উদ্যোক্তা পীরগাছা গ্রামের বাসিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক লতা বেগম জানান, তার সমিতিতে ৩৫ জন সদস্য মাসিক ৫০০ টাকা দিয়ে ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় গরু কিনেছেন।

অনুশীলন একাডেমির অধ্যক্ষ ফারহানা আকতার জানান, তার সমিতির ৪০ জন সদস্য মাসিক ৩০০ টাকা করে জমা দিয়ে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা সংগ্রহ করেছেন। সেই অর্থে একটি ষাঁড় গরু কেনা হয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ৫ মণ মাংস পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, সমিতির মাধ্যমে প্রতি কেজি মাংসের দাম পড়ছে প্রায় ৬৬৫ থেকে ৬৭০ টাকা, যা বাজারদরের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তার মতে, উপজেলায় প্রায় ২০০টি গ্রামে এ ধরনের উদ্যোগে অন্তত ৬০০টির বেশি গরু জবাই হয়েছে, যার বাজারমূল্য ছয় থেকে সাত কোটি টাকারও বেশি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী আক্তার বলেন, এ ধরনের সমবায় উদ্যোগ সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলে এবং বাজারে চাপ কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ সামাজিক সম্প্রীতি বাড়ায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘যুদ্ধের ব্যাপারে যদি আগে জানতাম, তাহলে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতাম’

ইরানের আকাশে ক্ষতিগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ মিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমান

ইসরায়েলের বৃহত্তম তেল শোধনাগারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ঈদের দিন সকালে ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কা নিয়ে যা বলছে আবহাওয়া অধিদপ্তর

‘আরটির সাংবাদিকদের ওপর ইসরায়েলি হামলা পরিকল্পিত’, কড়া প্রতিক্রিয়া রাশিয়ার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত