Ajker Patrika

ভান্ডারিয়ায় ইসমাইল হত্যা, স্ত্রী ও তিন ছেলে গ্রেপ্তার

পিরোজপুর প্রতিনিধি
ভান্ডারিয়ায় ইসমাইল হত্যা, স্ত্রী ও তিন ছেলে গ্রেপ্তার

পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় ক্লুলেস হত্যার ১৬ ঘণ্টার মধ্যে রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। আজ সোমবার এ ঘটনায় চারজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নিয়েছে।

মাত্র ১৬ ঘণ্টার তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা এলাকায় ইসমাইল শরীফকে (৬০) বাইরে নয়, তাঁর নিজের বসতঘরেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরে হত্যার ঘটনা আড়াল করতে মরদেহ নিয়ে ফেলে রাখা হয় নদীর বেড়িবাঁধ এলাকায়। এ ঘটনায় নিহত ইসমাইলের ছোট ভাই জয়নাল শরীফ বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন।

এ ঘটনায় নিহত ইসমাইলের স্ত্রী শেফালী বেগম (৫০) এবং তিন ছেলে রুবেল শরীফ, রুমান শরীফ ও রাসেল শরীফকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা কুঠারসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত।

লাশ পড়ে ছিল নদীর বেড়িবাঁধের পাশে। দেখে মনে হচ্ছিল, সেখানেই হয়তো খুন করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশের চোখে ধরা পড়ে মরদেহের মাথা ও কানের পাশে লেগে থাকা কাঠখেকো ঘুণপোকার গুঁড়ো। সেই অতি ক্ষুদ্র আলামতই শেষ পর্যন্ত খুলে দেয় পুরো হত্যার রহস্যের জট।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল রোববার সকাল ৬টার দিকে তেলিখালী ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন এলাকায় রক্তাক্ত একটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর পেয়ে ভান্ডারিয়া থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা হয় ইসমাইল শরীফ হিসেবে। মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি প্রথমে একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড হিসেবেই সামনে আসে। পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানোর পাশাপাশি শুরু করে ছায়া তদন্ত।

প্রাথমিক সন্দেহের তালিকায় আসেন নিহত ইসমাইলের স্ত্রী ও তিন ছেলে। তাঁদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও শুরুতে তাঁরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন। তদন্তে নাটকীয় মোড় আসে মরদেহের সুরতহাল ও ছবি বিশ্লেষণের সময়। তদন্তকারীদের নজরে পড়ে—নিহত ইসমাইলের মাথা ও কানের পাশে থাকা কাঠখেকো ঘুণপোকার গুঁড়ো।

এই সামান্য আলামত নিয়েই তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়, হত্যাকাণ্ডের মূল ঘটনাস্থল হয়তো বেড়িবাঁধ নয়। ঘুণপোকার গুঁড়ো যদি মরদেহে লেগে থাকে, তাহলে হত্যার আগে মরদেহ কোনো কাঠের ঘর বা কাঠের তৈরি স্থাপনার সংস্পর্শে ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা শুরু হয়।

একপর্যায়ে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন, নিহত ইসমাইলের ঘরের বারান্দায় চালার বাঁশ ও কাঠের গুঁড়ো, মাটির মেঝেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন এবং রক্তের স্পষ্ট দাগ দেখতে পান। একের পর এক আলামত মিলতে থাকায় পুলিশের কাছে পরিষ্কার হতে থাকে, হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে ইসমাইল শরীফের নিজের ঘরেই।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ভেঙে পড়েন নিহত ইসমাইলের ছোট ছেলে রাসেল শরীফ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বারান্দার খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা কুঠার।

পরে রাতে সিআইডির ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। সংগ্রহ করা হয় রক্তমাখা মাটি ও ঘুণপোকার গুঁড়োও। এ ছাড়া নিহত ইসমাইলের স্ত্রী শেফালী বেগমের শরীরেও রক্তের চিহ্ন পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও দাম্পত্যকলহের বিষয়টি সামনে এসেছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারির ঘটনা ঘটত বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার হবে বলে জানিয়েছে তারা।

ভান্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান বলেন, ঘটনাস্থলের অতি ক্ষুদ্র আলামত ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র ১৬ ঘণ্টার মধ্যে ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডটির রহস্য উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা ও অধিকতর তদন্ত শেষে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত