Ajker Patrika

‘ছেলের ঘরে একটু ঠাঁই চাই’—অসুস্থ মায়ের আকুতি, ‘সঙ্গে দিলে সুইসাইড করব’ বললেন ছেলে

পাবনা ও সাঁথিয়া প্রতিনিধি
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৬: ২৯
‘ছেলের ঘরে একটু ঠাঁই চাই’—অসুস্থ মায়ের আকুতি, ‘সঙ্গে দিলে সুইসাইড করব’ বললেন ছেলে
ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা। তবে মন গলেনি ছেলের। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘আমি ছেলের কাছে টাকা-পয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়েও ছেলের সঙ্গে থেকে বাকি জীবনটা পার করতে চাই।’—এভাবেই ছেলের ঘরে একটু আশ্রয় চাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন অসুস্থ মুন্নি খাতুন (৫০)। তবে মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে নারাজ ছেলে সাগর হোসেন (৩০)। এমনকি মাকে সঙ্গে রাখার অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব।’

ছেলের কাছ থেকে আশ্রয় ও ভরণপোষণ পাওয়ার আশায় পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন মুন্নি খাতুন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউএনও সেলিম আহমেদের কার্যালয়ে এ অভিযোগের শুনানি হয়।

অভিযুক্ত সাগর হোসেন উপজেলার সোনাতলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে। তিনি উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, মুন্নি খাতুনের স্বামী সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। তাঁদের দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে সাগর ও এক মেয়ে রয়েছেন। মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বৃদ্ধ বয়সে মুন্নি খাতুনের একমাত্র অবলম্বন ছেলে সাগর। তবে বিয়ের পর থেকেই মায়ের সঙ্গে সাগরের পারিবারিক বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে মাকে নিয়মিত ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন তিনি। নিজের সঙ্গে রাখতেও অনীহা প্রকাশ করেন।

ছেলের কাছ থেকে ভরণপোষণ ও আশ্রয় পাওয়ার আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন মুন্নি খাতুন। স্থানীয়ভাবে সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও স্থায়ী কোনো সুরাহা হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগে নিজের অসুস্থতা, অসহায়ত্ব এবং ছেলের সঙ্গে থেকে বাকি জীবন কাটানোর আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন।

গতকাল বিকেলে ইউএনওর কার্যালয়ে অভিযোগটির শুনানি হয়। সেখানে মুন্নি খাতুন ও সাগর হোসেনের বক্তব্য শোনা হয়। এ সময় ইউএনও সেলিম আহমেদ ছেলেকে মায়ের দায়িত্ব নেওয়া এবং তাঁকে নিজের সঙ্গে রেখে দেখাশোনা করার বিষয়ে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের শেষ বয়সের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে মানবিকভাবে সমস্যাটির সমাধান করার অনুরোধও জানান তিনি।

তবে মাকে নিজের সঙ্গে না রাখার বিষয়ে অনড় থাকেন সাগর। একপর্যায়ে ইউএনওকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব। মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব।’

পরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সাগর হোসেনকে কয়েক দিনের সময় দেন ইউএনও। এ সময়ের মধ্যে মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার বিষয়ে সমাধানে আসতে তাঁকে বলা হয়। তা না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান ইউএনও।

এ বিষয়ে মুন্নি খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি অসুস্থ মানুষ, হার্টের রোগী। এখন আমার ছেলে ছাড়া আর কে আছে? আমি ছেলের কাছে টাকা-পয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়েও যদি ছেলের সঙ্গে থাকতে পারি, তাহলে বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারব।’

মুন্নি খাতুন আরও বলেন, ‘আমি তো মায়ের অধিকার নিয়ে ছেলের ঘরে থাকতে চাই। শেষ বয়সে সন্তানের কাছে একটু আশ্রয় চাইছি। এর বেশি আমার কোনো চাওয়া নেই।’

নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘মা-ছেলের বিষয়টি শুরু থেকেই আমি সমাধানের চেষ্টা করেছি। তবে কোনো কিছুতেই রাজি হন না ছেলে। আমরা স্থানীয়রা সমস্যাটি সমাধানে ব্যর্থ হয়েছি। পরবর্তী সময়ে তাঁর মা ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেন।’

ইউএনও সেলিম আহমেদ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়েছে। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা তাঁর সন্তানের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ প্রত্যাশা করছেন। ছেলেকে বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁকে কয়েক দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত