গুরুদাসপুরে ১১ ইটভাটার ৯টিই অবৈধ, দূষণে বিপর্যস্ত পরিবেশ

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নাটোরের গুরুদাসপুরে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়াই ইটভাটার কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার আবাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য, কৃষিজমি ও পরিবেশ। ইটভাটার ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে বাতাস, কমছে ফসলের উৎপাদন। অন্যদিকে মাটি ও ইট পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক্টর-ট্রলির চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাকা সড়ক। তা ছাড়া প্রশাসনও ঠিকমতো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কোথাও দায়সারা অভিযান চালানো হলেও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার অনেকগুলোর চিমনির উচ্চতা কম। ফলে নির্গত ধোঁয়া আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এতে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ইটভাটার আশপাশের কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ইটভাটায় ইট তৈরির জন্য তিন ফসলি কৃষিজমির মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও কাঠখড়ি পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হচ্ছে। মাটি ও ইট পরিবহনের ভারী ট্রাক্টর-ট্রলির কারণে গ্রামীণ পাকা সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ইটভাটার মালিকদের কেউ কেউ প্রয়োজনীয় অনুমোদনের কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত ছাড়া কৃষিজমি, বনভূমি ও আবাসিক এলাকার আশপাশে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার এবং কৃষিজমি, পুকুর, নদী, খাল ও জলাভূমি থেকে মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পুকুর খননের কারণে উপজেলায় প্রায় ১২০ হেক্টর তিন ফসলি জমির পরিমাণ কমেছে। এসব জমিতে ধান, পাট, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হতো। এর ফলে ধানের উৎপাদন প্রায় ১০০ টন কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে সর্বশেষ ২০২৪ সালের শেষের দিকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত এক অভিযানে উপজেলার ৯টি অবৈধ ইটভাটাকে মোট ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে জরিমানার পরও এসব ইটভাটার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুরুদাসপুর পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে মোট ১১টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি ইটভাটার লাইসেন্স রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আবাসিক এলাকার মধ্যে থাকা পাঁচটি ইটভাটার মালিক হলেন চাঁচকৈড়ের মোশাররফ হোসেনের মেসার্স এমবিপি ব্রিকস, আব্দুস সালাম সবুজের মেসার্স একেবি ব্রিকস, জহুরুল সোনারের মেসার্স এমডিআর ব্রিকস, জাহাঙ্গীর সোনারের মেসার্স এমডিএস ব্রিকস এবং আমজাদ-মফিজের মেসার্স এএমবি ব্রিকস।
এ ছাড়া সাহাপুরে আজাহার প্রামাণিকের মেসার্স এইচবিবি ব্রিকস, আজাহার বালুর মেসার্স এইচআরবি ব্রিকস, কাদের হাজীর মেসার্স এইচকেবি ব্রিকস, মজনু সরদারের মেসার্স এমএসবি ব্রিকস, হাজীর হাটে জাহিদুল ইসলামের মেসার্স এমডিপি ব্রিকস এবং চন্দ্রপুরে রেজাউল হাসান রানার মেসার্স আরআরবি ব্রিকস রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ইটভাটার কয়েকটি তিন ফসলি কৃষিজমি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে গড়ে উঠেছে।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ইটভাটাগুলোর ভ্যাট, আয়কর, ট্রেড লাইসেন্স, কলকারখানা, বিএসটিআই ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স রয়েছে। তবে কোনো ইটভাটারই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। দুটি ভাটার লাইসেন্স রয়েছে। পর্যায়ক্রমে ইটভাটা বন্ধ করতে হলে মালিকদের আগে থেকে জানাতে হবে।
অন্যদিকে, মেসার্স আরআরবি ব্রিকসের মালিক রেজাউল হাসান রানা ও মেসার্স এমডিপি ব্রিকসের মালিক জাহিদুল ইসলাম জানান, তাঁরা নিয়ম মেনেই ইটভাটা পরিচালনা করছেন। তাঁদের দাবি, ইটভাটার ছাড়পত্রও রয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো সমস্যা নেই।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, ইটভাটা পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বা প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত ইটভাটার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








