মোবাইল অ্যাপেই গরুর খামার নিয়ন্ত্রণ, নওগাঁয় প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে পশুপালন

সনাতন পদ্ধতির খামার ব্যবস্থাপনা ছেড়ে আধুনিক প্রযুক্তির পথে হাঁটছেন নওগাঁর খামারিরা। এখন মোবাইল ফোনের একটি অ্যাপের মাধ্যমেই দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে গরুর খামারের পরিবেশ। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা থেকে শুরু করে ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাসের উপস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে মুহূর্তেই। ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ (আইওটি) প্রযুক্তির ব্যবহারে সহজ হচ্ছে খামার পরিচালনা, কমছে শ্রম ও সময়ের অপচয়। পাশাপাশি গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে লোকসানের ঝুঁকিও কমছে।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী’র বাস্তবায়নে নওগাঁ সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের তরুণ খামারি নূরে আলমের খামারে চালু করা হয়েছে এ প্রযুক্তি।
খামারটিতে প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে স্মার্ট সেন্সর। এসব সেন্সরের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা খামারের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাসের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংগৃহীত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে যাচ্ছে খামারির মোবাইল ফোনের অ্যাপ কিংবা মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গবাদিপশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সুস্থতার জন্য খামারের পরিবেশ অনুকূলে রাখা জরুরি। অতিরিক্ত গরমে গরু হিট স্ট্রেসে আক্রান্ত হতে পারে। এতে পশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও বাড়ে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে দক্ষ খামার শ্রমিকের সংকটও রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইওটি প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
খামারের তাপমাত্রা বা আর্দ্রতায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটলে কিংবা অ্যামোনিয়া গ্যাসের মাত্রা বেড়ে গেলে খামারির মোবাইল ফোনে চলে আসে সতর্কবার্তা। শুধু তা-ই নয়, অ্যাপের মাধ্যমে দূর থেকেই খামারের ফ্যান, ব্লোয়ার, লাইট, স্প্রিংকলার ও এক্সহস্ট ফ্যান চালু বা বন্ধ করা যায়। ফলে খামারে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
প্রযুক্তির সুফল নিয়ে খামারি নূরে আলম বলেন, ‘আগে আবহাওয়া খারাপ হলে বা অতিরিক্ত গরমে গরু অসুস্থ হয়ে পড়ত। খামারে গ্যাস জমেছে কি না, তা বুঝতে পারা কঠিন ছিল। এখন সেন্সরের মাধ্যমে ফোনের অ্যাপেই সব তথ্য পেয়ে যাই। দূরে থাকলেও মোবাইল থেকে ফ্যান বা স্প্রিংকলার চালু করে দিতে পারি। এতে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা যেমন কমেছে, তেমনি গবাদিপশুর রোগবালাই কমে উৎপাদনও অনেক বেড়ে গেছে।’
স্থানীয় খামারি একরামুল হক বলেন, ‘হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে খামার সামলানো এবং গরুর সুস্বাস্থ্য টিকিয়ে রাখা সব সময় আমাদের জন্য কঠিন ছিল। এখন দেখি মোবাইল ফোনের অ্যাপ দিয়েই খামারের ফ্যান আর তাপমাত্রা সব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। এটা দেখে সত্যি অবাক হয়েছি। আমাদের মতো প্রান্তিক খামারিদের খামারে যদি এমন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যায়, তবে লোকসানের ঝুঁকি আর থাকবে না।’
উন্নয়ন সংস্থা মৌসুমীর প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নূর হোসেন বলেন, ‘গরুর খামারে আইওটি প্রযুক্তির ব্যবহার গবাদিপশু পালনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রথাগত খামারে হিট স্ট্রেস ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে পশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতো, যা খামারিদের বড় ঝুঁকিতে ফেলত। গোবিন্দপুরের খামারি নুর এ আলম এখন একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পিকেএসএফের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে খামারের ঝুঁকি কমিয়ে এটিকে লাভজনক ব্যবসায় রূপ দেওয়া সম্ভব।’
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গবাদিপশু পালনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। প্রথাগত পদ্ধতিতে তাপমাত্রা বা হিট স্ট্রেসের কারণে খামারিরা প্রায়ই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। নওগাঁর গোবিন্দপুর গ্রামের এই খামারে আইওটি প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ আমাদের ডেইরি খাতকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে আমরা এ ধরনের প্রযুক্তিভিত্তিক খামারগুলোকে সব ধরনের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিতে সব সময় প্রস্তুত আছি।’









