Ajker Patrika

নরসিংদীতে গ্রাম থেকে শহরে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, বাড়ছে চুরি-ছিনতাই

মো. সাইদুল ইসলাম, নরসিংদী
নরসিংদীতে গ্রাম থেকে শহরে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, বাড়ছে চুরি-ছিনতাই

নরসিংদীতে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—প্রায় সর্বত্রই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে মাদক। জেলার ছয়টি উপজেলার পাশাপাশি চরাঞ্চলগুলোতেও ইয়াবা, গাঁজা, মদসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের অবাধ বিস্তার ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মাদকের সহজলভ্যতার কারণে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও সহিংসতার মতো অপরাধ।

সম্প্রতি (২৭ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিওতে দেখা যায়, নরসিংদীর পৌর শহরের রাঙামাটি এলাকায় মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় এক যুবকের ওপর রামদা দিয়ে হামলা চালায় এক মাদক ব্যবসায়ী। স্থানীয়দের মতে, এ ঘটনা মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য ও প্রভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নরসিংদীতে মাদক বিস্তারের অন্যতম কারণ জেলার ভৌগোলিক অবস্থান। ভারতের সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নিকটবর্তী হওয়া, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংযোগ, ঢাকা- চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট রেলপথ ও মেঘনা নদীকেন্দ্রিক নৌপথ ব্যবহার করে সহজেই জেলায় মাদক প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

চরদিঘলদী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নটি সম্পূর্ণ নদীবেষ্টিত। বিভিন্ন এলাকা থেকে নদীপথে মাদক আসে। অনেক স্থানে দ্রুত পুলিশ পৌঁছানোও কঠিন। মাদক নির্মূলে আমরা স্থানীয়ভাবে কাজ করছি। কয়েক দিন আগে এলাকাবাসী এক মাদক ব্যবসায়ীর বাড়িঘর ভেঙে দিয়েছে।’

আলোকবালী ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক। তরুণেরা মাদকে জড়িয়ে পড়ায় অপরাধও বাড়ছে। যারা মাদক ব্যবসা করে, তারা বিভিন্ন প্রভাবশালীর ছত্রচ্ছায়ায় থাকে বলেই এসব চালিয়ে যেতে পারছে।’

নরসিংদী পৌরসভার ভাগদী এলাকার বাসিন্দা রাকিব খন্দকার বলেন, ‘আমাদের সামনেই মাদক বিক্রি ও সেবন হয়। প্রতিবাদ করতে ভয় লাগে, কারণ তাদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। সম্প্রতি মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় একজনকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। প্রশাসন আরও কঠোর হলে এসব বন্ধ করা সম্ভব।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর নরসিংদী জেলা সেক্রেটারি হলধর দাস বলেন, নরসিংদীতে মাদক প্রচুর পরিমাণে বেড়ে গেছে। তবে নরসিংদীর সংসদ সদস্য ইতিমধ্যে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। এটি বাস্তবায়িত হলে নরসিংদীতে অবশ্যই মাদক নির্মূল করা সম্ভব। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতন থাকতে হবে। মাদক নির্মূল করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও সদিচ্ছা থাকতে হবে। কারণ অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও কেউ কেউ এসবে জড়িত থাকেন। সকলে মিলে এক সঙ্গে চেষ্টা করতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, নরসিংদীর উপপরিচালক মোহাম্মদ হাবীব তৌহিদ ইমাম বলেন, ‘জনবল সীমিত হলেও আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খবর পেলেই তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আপনাদের সাংবাদিকদের কাছে কোনো তথ্য থাকলেও আমাদের দিতে পারেন, আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিব।’

নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন চন্দ্র সরকার বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান নিয়মিত চলছে। এ পর্যন্ত শতাধিক মাদক-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে এবং সেগুলোর তদন্ত চলমান। অনেক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

মাদক নির্মূলে প্রশাসনের চলমান অভিযানের পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া মাদকের বিস্তার রোধ করা কঠিন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত