Ajker Patrika

বনের গাছ কেটে বসতি

সুমন আলী, নওগাঁ
বনের গাছ কেটে বসতি
বনের জায়গায় গড়ে তোলা একটি পাকা ঘর। সম্প্রতি পত্নীতলার পাইকবান্দা বিট অঞ্চলে। ছবি: আজকের পত্রিকা

নওগাঁর বনভূমি এখন দখল ও গাছখেকো চক্রের কবলে। দিনরাত নির্বিচারে গাছ কেটে উজাড় করা হচ্ছে সরকারি বনাঞ্চল, আর দখল হওয়া জমিতে গড়ে উঠছে বসতবাড়ি। ইতিমধ্যে কয়েক শ একর বনভূমি দখল হয়ে গেলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি বন বিভাগ। লোকবলসংকটের অজুহাতে দায় এড়ানোর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

জানা যায়, নওগাঁর পত্নীতলা, ধামইরহাট ও সাপাহার উপজেলায় সবচেয়ে বেশি বনাঞ্চল রয়েছে। এ তিনটি বিটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয় পত্নীতলা উপজেলার পাইকবান্দা বন বিট অঞ্চলে। সরেজমিনে দেখা যায়, পাইকবান্দা বনভূমির আওতায় কৃষ্ণপুর-আলপাকা সড়কের দুই পাশের বেশ কিছু ছোট-বড় বাড়ি গড়ে উঠেছে। যেগুলোর দু-একটি ইট-কংক্রিটের তৈরি।

বনে বাড়ি নির্মাণ করেছেন মো. সহিমুদ্দিন। কিছুদিন আগে প্রায় ৩ শতক জায়গায় গড়ে তুলেছেন একাধিক কক্ষবিশিষ্ট বাড়ি। নিয়েছেন বিদ্যুতের লাইনও। তিনি বাড়িতে না থাকায় কথা হয় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁরা গরিব মানুষ। জায়গাজমি নেই। তাই বনের জায়গাতেই বাড়িটি নির্মাণ করে থাকছেন। তিনি দাবি করেন, বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মীকে টাকা দিতে হয়েছে।

সহিমুদ্দিনের বাড়ির পাশেই আরেকটি মাটির বাড়ি নির্মাণ করেছেন রিজিয়া নামের ২৮ বছর বয়সী এক নারী। টিনের চালার দুটি ঘর ও একটি রান্নাঘর নির্মাণ করেছেন তিনি। সরকারি জায়গায় বাড়ি নির্মাণের কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, কোথাও মাথা গোঁজার জায়গা না পেয়ে প্রায় দেড় বছর আগে এই বাড়ি নির্মাণ করেছেন। শুরুতেই বন বিভাগের লোকজন তাঁকে বাধাও দেন। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই বাড়িটি নির্মাণ সম্পন্ন করে বসবাস শুরু করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দখলকারীদের অনেকেই জায়গাগুলো নিজেদের দাবি করে বন বিভাগের বিরুদ্ধেই মামলা করেছেন। তেমনই একজন ধামইরহাট বন বিটের আওতায় জয়জয়পুর গ্রামের এ টি এম বদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আরএস রেকর্ড অনুযায়ী জায়গাটি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি। সেখানে একটি পুরোনো বাড়িও ছিল। তবে এরই মধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে বন বিভাগ। জায়গাটি সরকারি বনভূমির অংশ দাবি করে রেকর্ড সংশোধনী মামলা করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। যার বাদী হয়েছেন স্থানীয় বন বিট কর্মকর্তা আনিসুর রহমান।

শুধু তা-ই নয়, দিনরাত বনের গাছ কাটছে কয়েকটি চক্র। এমনই একজন আলপাকা গ্রামের হাবিবুর রহমান। তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা মেলে বনের গাছের স্তূপ। তার মধ্যে ছোট-বড় সব রকম গাছই আছে। তবে হাবিবুর রহমান বাড়িতে না থাকায় কথা হয় তাঁর পুত্রবধূ মেরিজা খাতুনের সঙ্গে। ভুল স্বীকার করে তিনি বলেন, আশপাশের সবাই গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছিল বলে তাঁরাও কেটেছেন।

পত্নীতলা পাইকবান্দা বন বিট কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া কথা বলা নিষেধ আছে। তবে জমি উদ্ধারে মামলা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিনিয়তই রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন।

বন বিভাগের তিনটি বিটের দায়িত্বে থাকা রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম ফরহাদ জাহান বলেন, ‘লোকবলসংকটের কারণে দায়িত্ব পালন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে কেউ জায়গা দখলের চেষ্টা করলে প্রথমেই বাধা দেন। এরপর না শুনলে মামলা করেন। এখন পর্যন্ত ৮০৯ একর জায়গা দখল রয়েছে নওগাঁ অঞ্চলে। যার বিপরীতে মামলা হয়েছে তিন শতাধিক।’ তিনি বলেন, মামলার দীর্ঘ হওয়ায় জমি উদ্ধারে অনেক দেরি হয়। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগায় ভূমি দখলকারী একটি চক্র।

পরিবেশকর্মী নাইস পারভীন বলেন, ‘এভাবে বনের গাছ নিধন ও বনভূমি দখল করে বাড়ি, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়, এটা শঙ্কার বিষয়। তিনি বলেন, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গাফিলতিও এর জন্য দায়ী। কখনো কখনো তাঁরা নিজেরাও এসবের পেছনে দায়ী। চক্রগুলোর সঙ্গে তাঁদের সখ্য কিংবা স্বজনপ্রীতির কারণেও এমনটা হয়ে থাকে। তবে এখনই যদি দখল আর গাছ কাটা চক্রগুলোকে না থামানো যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ সময় দেখতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত