Ajker Patrika

ময়মনসিংহের ভালুকা: সংকটে সেই কুমিরের খামার

  • ৭৫টি নিয়ে যাত্রা শুরু করা খামারে কুমির আছে প্রায় ৪ হাজার
  • আইনি জটিলতার কারণে কয়েক বছর ধরে চামড়া রপ্তানি বন্ধ
  • কুমিরের পজেশন ফি বাবদ সরকারের পাওনা কয়েক কোটি টাকা
ইলিয়াস আহমেদ, ময়মনসিংহ 
ময়মনসিংহের ভালুকা: সংকটে সেই কুমিরের খামার
প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমিরের খামার। সম্প্রতি ময়মনসিংহের ভালুকার হাতিবেড় গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ময়মনসিংহের ভালুকার আলোচিত সেই কুমির খামার এখনো চলছে, তবে ধুঁকে ধুঁকে। আইনি জটিলতার কারণে কয়েক বছর ধরে চামড়া রপ্তানি বন্ধ। এ কারণে আয়ও বন্ধ। প্রতিটি কুমিরের পজেশন ফি বাবদ প্রতিবছর যে টাকা সরকারের পাওয়ার কথা, তা-ও দিচ্ছে না খামারের মালিক উদ্দীপন এনজিও।

২০০৪ সালে ময়মনসিংহের ভালুকার হাতিবেড় গ্রামে প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমিরের খামার রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড। খামারের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন মুশতাক আহমেদ। আর ৩৬ শতাংশ মালিকানা নিয়ে সঙ্গে ছিলেন মেজবাউল হক। ২০১২ সালে খামারের শেয়ার ছেড়ে দিলে মালিকানায় চলে আসেন প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার। এরপর খামার দেখিয়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ঋণ বের করে নেন তিনি। ২০২০ সালে অর্থ কেলেঙ্কারি মামলায় সরকার পি কে হালদারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করলে হুমকিতে পড়ে খামারটি। এরপর নিলামের মাধ্যমে খামারটি ৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকায় কিনে নেয় উদ্দীপন এনজিও। কয়েক দফা হাতবদলের পরেও খামারটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।

৭৫টি কুমির নিয়ে যাত্রা শুরু করা খামারটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে কুমিরের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। নীতিমালা করার আগে ২০১০ সালে জার্মানিতে ৬৭টি হিমায়িত কুমির এবং ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫০৭টি কুমিরের চামড়া জাপানে রপ্তানি করা হয়। বর্তমানে আইনি জটিলতায় বন্ধ রয়েছে কুমির রপ্তানি। কর্তৃপক্ষ বলছে, জটিলতা নিরসনে তারা আদালতে দৌড়ঝাঁপ করছে।

২০১৯ সালে কুমির লালন-পালন বিধিমালায় কুমিরপ্রতি বার্ষিক ১ হাজার টাকা পজেশন ফি নির্ধারণ করে সরকার। বর্তমানে খামারটিতে প্রায় চার হাজার কুমির থাকলেও এখনো পরিশোধ করা হয়নি কোনো পজেশন ফি।

এ প্রসঙ্গে উদ্দীপন এনজিওর উপদেষ্টা মীর খাইরুল আলম বলেন, ‘কুমিরের চামড়া রপ্তানি করতে অনেক প্রসেসিং সম্পন্ন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের আইন জটিল। তবে আমরা নিয়ম অনুযায়ী উচ্চ আদালতের মাধ্যমে এগোচ্ছি। আমাদের কুমিরও রপ্তানি করা খুব প্রয়োজন। আশা করছি, দ্রুততম সময়ে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’

তবে বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, যারা কুমির খামার পরিচালনা করে আসছে বা করছে, তাদের বিজনেসের মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। পজেশন ফি পরিশোধের জন্য তাদের কাছে বারবার লেখালেখি করা হয়েছে; কিন্তু তারা আদালতে মামলা করে তা স্থগিত রাখছে। ভালুকার খামারটিতে কয়েক কোটি টাকা পজেশন ফি বকেয়া রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের উৎপাদন মানসম্পন্ন নয়। তারা কোয়ালিটির দিকে নজর না দিয়ে ব্যাংক লোনের জন্য শুরু থেকে স্বপ্ন দেখতে থাকে। কোনোভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যাংক লোন নিয়ে সেই টাকা মেরে দেওয়ার জন্য নানা ফন্দি আঁটে।’

এ নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল আলমের সঙ্গে। তাঁর মতে, সম্ভাবনাময় কুমির চাষ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পজেশন ফি সহজীকরণ, চামড়ার পাশাপাশি কুমিরের মাংস, দাঁতসহ অন্যান্য উপজাতদ্রব্য রপ্তানিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। রফিকুল আলম বলেন, সরকারের পজেশন ফি প্রতিবছর নবায়ন করে কুমির খামার পরিচালনা করা খুবই কঠিন। সেটি এককালীন হলে সহজসাধ্য হয়। তবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হলে যারা খামার করছে, তাদের প্রাণীর রেজিস্ট্রেশন থাকা জরুরি। প্রতিটি কুমিরকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য নম্বরও প্রয়োজন।

খামারে হতাশ দর্শনার্থীরা

এদিকে চামরা রপ্তানি না হলেও এখনো দর্শনার্থীরা আসে কুমির দেখতে। সম্প্রতি খামারে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি টিকিট ২০০ টাকায় কিনে দর্শনার্থীরা কাছ থেকে কুমির দেখছে। শুধু কুমির দেখা ছাড়া বিনোদনের আর কিছু না থাকায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে।

কুমির দেখতে আসা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘গাজীপুর থেকে এসেছি কুমির দেখব বলে। তবে কাছ থেকে কুমির দেখতে পেলেও এখানে আর কোনো বিনোদনের মাধ্যম না থাকায় অনেকটাই হতাশ। চা খাওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। ভেতরে কয়েকটি দোকানের পাশাপাশি শিশুদের জন্য রাইডের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো।’

স্থানীয় প্রবাসী সিরাজুল ইসলাম বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে রয়েছি। সেখানে থেকে ইউটিউবের মাধ্যমে বাড়ির পাশের খামারটি দেখে খুবই উৎফুল্ল হই। কিন্তু এবার বাড়িতে এসে খামারটির অবস্থা দেখে হতাশ হয়েছি। মনে হচ্ছে, যারা খামারটি পরিচালনা করছে, এটির প্রতি তাদের দরদ একেবারেই নেই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত