Ajker Patrika

মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী বামন্দী পশুর হাটে জমে উঠেছে বেচাকেনা, বেশি চাহিদা মাঝারি গরুর

রাকিবুল ইসলাম, গাংনী (মেহেরপুর) 
মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী বামন্দী পশুর হাটে জমে উঠেছে বেচাকেনা, বেশি চাহিদা মাঝারি গরুর
মেহেরপুর গাংনী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বামন্দী পশুর হাটে বেড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মেহেরপুর গাংনী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বামন্দী পশুর হাটে বেড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই হাটটি ঐতিহ্য বহন করে আসছে মেহেরপুর জেলার। এই পশুর হাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা গরুর দড়ি ধরে আছে ক্রেতাদের আশায় আর ক্রেতারা কোরবানির জন্য খুঁজছে নিজের পছন্দমতো গরু, ছাগল ও ভেড়া। জেলার চাহিদা পূরণ করে কোরবানি পশু রাজধানী ঢাকাসহ চলে যায় বিভিন্ন জেলায়। আর এই মুহূর্তে পশু বিক্রির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে খামারি ও বাড়িতে পশু পালনকারীরা। তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে মাঝারি গরুগুলোর।

কৃষকের বাড়িতে দু-একটি করে লালন-পালন হলেও খামারে রয়েছে অনেক গরু-ছাগল-ভেড়া। অনেক কৃষক শখের বসেই পারিবারিকভাবেই মহিষ পালন করে থাকে। গাংনীতে বেশ কয়েকটি ছাগল ও ভেড়ার বাণিজ্যিক খামার থাকলেও পারিবারিক খামারেও ছাগল ও ভেড়া বেশি পালিত হচ্ছে। বসতবাড়িতে দু-একটি গরু পালন করা প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক পরিবারের। সারা বছর গরু পালনের পর এখন এসেছে বিক্রয়ের সময়। গরু বিক্রির টাকায় মিটবে পরিবারের আর্থিক চাহিদা। বাড়তি অর্থ দিয়ে আবারও গরু কিনবে। এভাবেই চলে গরু পালনকারী পরিবারগুলো।

গতকাল সোমবার বিকেলে গাংনী উপজেলার বামন্দী পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রচুর পরিমাণে কোরবানির পশু উঠেছে। হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের চরম ভিড় লক্ষ করা গেছে। মাঝারি ধরনের গরু সবচেয়ে বেশি বিক্রয় হতে দেখা গেছে।

গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্র জানায়, গাংনী উপজেলায় কোরবানিযোগ্য গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার রয়েছে। উপজেলায় কোরবানির চাহিদা রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার পশুর। বাকি পশু ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে।

গরু খামারি হাড়িয়াদহের মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সন্তানের মতো পরম আদর যত্ন ও মমতায় গরু লালন-পালন করি। গরুকে বিচালি, ঘাস, ভুট্টা, খৈলসহ প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো হয়। কোনো প্রকার কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। ইতিমধ্যে তিনটি গরু বিক্রি হয়েছে। তিনটি গরু প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা হয়েছে। আরও তিনটা আছে সাড়ে আট লাখ টাকা পর্যন্ত বলছে। ভালো দাম না পেলে বিক্রয় করব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার খামারিদের বিনা সুদে লোন দিলে বেকার যুবকেরা এ পেশায় এগিয়ে আসবে। বেকারত্ব দূর করার ব্যাপারে গরু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমাদের দেশে যাঁরা বেকার আছেন, তাঁরা যদি গরু পালন করে তাহলে পরিবারের বোঝা হতে হবে না। পরিবারের হাল ধরার জন্য গরু পালন করা উচিত।’

খামারি মহিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমি পারিবারিক খামারে গরু পালন করেছি। কোরবানির জন্য পশুগুলো বিক্রি করে দেব। এখন খুব ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে কোরবানির পশু নিয়ে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সহযোগিতা করছেন পশু পালনে। গরুর খাদ্যের দাম বেশি ও তীব্র গরমে পশু পালন করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। বামন্দী পশুর হাটে গরু নিয়ে এসেছি, ভালো দাম পেলে বিক্রি করে দেব।’

মেহেরপুর গাংনী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বামন্দী পশুর হাটে বেড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। ছবি: আজকের পত্রিকা
মেহেরপুর গাংনী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বামন্দী পশুর হাটে বেড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। ছবি: আজকের পত্রিকা

বামন্দী পশুর হাটে গরু কিনতে আসা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বামন্দী হাটে অনেক গরু উঠেছে। পছন্দমতো গরুর খোঁজ করছি। দাম আর পছন্দ হলে কিনে ফেলব। দেশের বাইরে ছিলাম। ছুটিতে এসেছি, পরিবারের সঙ্গে ঈদ করব বলে। তবে গরু ও ছাগলের দাম অনেক বেশি। তারপরও কিনব। আজ হাটে পছন্দ না হলে আগামী হাটে আসব।’

বামন্দী হাটে আসা মো. মতিয়র রহমান নামের একজন ক্রেতা বলেন, ‘কোরবানির জন্য গরু কিনতে এসেছি, পছন্দ হয়েছে। তবে দাম অনেক বেশি। তারপরও ক্রয় করেছি। অনেকে কোরবানির পশু কেনার জন্য দেখাদেখি করছে। মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহাকে ঘিরে ব্যাপক পরিমাণে এই হাটে কোরবানির পশু আমদানি হয়।’

ছাগল ব্যবসায়ী আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারে বড় ছাগলের ব্যাপক চাহিদা। বিভিন্ন গ্রাম থেকে ছাগলগুলো কিনে এনেছি। আর গ্রামের লোকজন প্রায় প্রতিটা বাড়িতে ছাগল লালন-পালন করে কোরবানি সামনে রেখে বিক্রি করে দেয়। এবার ছাগলের অনেক দাম। শুক্র ও সোমবার এই পশুর হাট বসে। প্রতি হাটে আলহামদুলিল্লাহ ভালো লাভ হয়।’

গরু ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এবার গরুর বাজারদর ভালো রয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি গরুর। হাটে পর্যাপ্ত গরু উঠেছে আর গরুর চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। আশপাশের বামন্দীর মতো বড় হাট আর কোথাও নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা আসে এই বামন্দীর হাটে। কারণ, ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো গরু এই হাটে পায়। তা ছাড়া প্রশাসনিকভাবে সব রকম ব্যবস্থা করে রেখেছে। এই পশুর হাটে কোনো রকম ঝামেলা হয় না। কোনো পশু অসুস্থ হলে সার্বক্ষণিক মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে।’

বামন্দী পশুর হাট ইজারাদার ও সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘বামন্দী পশুর হাট মেহেরপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী একটি পশুহাট। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই হাট ঐতিহ্য বহন করে আসছে জেলার। সপ্তাহে দুই দিন সোম ও শুক্রবার এ হাট বসে। কেউ জাতে প্রতারণার শিকার না হয়, সে জন্য আমরা সব সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া এ বিষয়ে প্রশাসন সব ধরনের খোঁজখবর নিচ্ছে। কোরবানি সামনে রেখে সব ধরনের পশু বেচাকেনা শুরু হয়েছে।’

গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার দাস বলেন, বামন্দী পশুর হাট, বিভিন্ন মার্কেটসহ কোরবানিকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে জন্য পুলিশ মাঠে রয়েছে।

গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, গাংনী উপজেলায় কোরবানিযোগ্য যা পশু প্রস্তুত রয়েছে, তা গাংনীসহ জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় কোরবানি পশুর চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পশুর জোগান রয়েছে গাংনী উপজেলায়।

গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন বলেন, ঈদকে সামনে রেখে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য বামন্দী পশুর হাটে পর্যাপ্ত পুলিশ প্রশাসন, জাল নোট শনাক্ত করার মেশিনসহ সব ব্যবস্থা রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত