Ajker Patrika

মেহেরপুরের গাংনী: ধান-গম ছেড়ে তামাক চাষ

  • চলতি বছর এরই মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে, আরও রোপণ চলছে
  • গত বছরের তুলনায় এখন পর্যন্ত ২০০ হেক্টর বেশি জমিতে তামাকের চাষ হয়েছে
  • তামাক কোম্পানির প্রলোভনে পড়ে কৃষকেরা অন্য ফসল ছেড়ে ক্ষতিকর আবাদে ঝুঁকছেন
  • তামাক চাষের কারণে কৃষিজমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে, ক্ষতি হচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবেশেরও
রাকিবুল ইসলাম (গাংনী) মেহেরপুর
মেহেরপুরের গাংনী: ধান-গম ছেড়ে তামাক চাষ
ধান, গমসহ বিভিন্ন ফসলের মাঠে তামাক চাষ করছেন এক কৃষক। সম্প্রতি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেরাইল মাঠে। ছবি: আজকের পত্রিকা

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেরাইল এলাকায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ধান, গমসহ নানা ধরনের ফসল। তারই মাঝখানে একখণ্ড জমিতে কোদাল দিয়ে তামাকগাছ পরিচর্যা করছেন এক কৃষক। একসময় এই জমিতেও বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হতো। অধিক লাভের প্রলোভনে এখন সেখানে ঢুকে পড়েছে তামাক চাষ। শুধু এই একটি মাঠে নয়, তামাক চাষের এমন দৃশ্য উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে। কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার তামাক চাষ আরও বেড়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর গাংনীতে প্রায় ২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হয়েছিল। চলতি বছর এরই মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। এখনো চারা রোপণ চলমান রয়েছে।

বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষকদের অভিযোগ, দেশে তামাক চাষ সরাসরি আইনত নিষিদ্ধ না হলেও এটি নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নেই কৃষি বিভাগের। তাদের যথাযথ তদারকি না থাকায় সুযোগ নিচ্ছেন তামাক কোম্পানির কর্মীরা। তাঁরা কৃষকদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে অন্য ফসল থেকে সরিয়ে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করছেন। এতে একদিকে সবজিসহ ফসল উৎপাদন যেমন কমছে, তেমনি তামাক চাষের ফলে কৃষিজমি উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে। উৎপাদিত এসব তামাক পুড়িয়ে প্রক্রিয়াজাত করার সময় ধোঁয়ায় পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। বাড়ছে এই কাজের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি।

সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার করমদী মাঠ, ধলার মাঠ, চোখতোলার মাঠ, ছাতিয়ান মাঠ, বাওট মাঠ, তেরাইল মাঠ, মোহাম্মদপুর মাঠ, খাসমহল মাঠসহ বিভিন্ন মাঠে তামাক চাষ হচ্ছে। গম, ভুট্টা, কলা, সরিষাসহ বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি জমিতে তামাক চাষ করছেন কৃষকেরা।

তামাকচাষিরা বলেন, তামাক চাষের জন্য বিভিন্ন কোম্পানি সার, বীজসহ নানা সুবিধা দিয়ে থাকে। এ জন্য জমির ক্ষতি হলেও তামাক চাষ করেন তাঁরা। তামাকের চেয়ে সবজিতে লাভ বেশি, কিন্তু তামাক কোম্পানি যে সুবিধা দেয়, কৃষি বিভাগ সেই সুবিধা দেয় না। তাই অনেকেই তামাক চাষে ঝুঁকছেন।

বাবর আলী নামের এক কৃষক বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে তামাক আবাদ করতে খরচ হয় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। একটি তামাক কোম্পানি এই চাষাবাদের জন্য বীজ, সার, কীটনাশক এবং তামাক পোড়ানোর জন্য ঘর নির্মাণের টাকা দেয়। কাজ করার জন্য পোশাক তৈরিতেও অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়। তিন থেকে চার মাসের এই আবাদে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা লাভ হবে আশা করছি।’

বাবর আলী বলেন, ‘তিন থেকে চার মাসের আবাদে যে লাভ হয়, তা অন্য ফসলে আদৌ সম্ভব নয়। এর আগে আমি অন্য ফসল আবাদ করেছি। এবার তামাকের আবাদ করছি। আর আমাদের আবাদ করতে যা লাগছে, কোম্পানি দিচ্ছে। আবার তামাক বিক্রির সময় তাঁরা কিনে নেবেন।’

আরেক কৃষক আবদুল মান্নান বলেন, ‘তামাক কোম্পানিগুলো যেভাবে সুবিধা দিয়ে তা চাষে উদ্বুদ্ধ করছে, কৃষি অধিদপ্তর অন্য ফসল আবাদের ক্ষেত্রে আমাদের সেই সুবিধা দিচ্ছে না। যদি আমাদের ভালো সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে তামাক চাষ কমে যাবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি তামাক কোম্পানির মাঠকর্মী বলেন, ‘তামাকচাষিদের বীজ, সার, টাকাসহ নানা সুবিধা দেওয়া হয়। এমনকি কৃষকদের তামাক বিক্রি নিয়েও কোনো ঝামেলা থাকে না। তাঁদের কাছ থেকে কোম্পানি তামাক পাতা কিনে নেয়। সাধারণত এই সুবিধাগুলোর কারণে তামাকচাষিরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।’

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল আজিজ বলেন, তামাক চাষ, সেবন ও ধোঁয়ায় ক্যানসারসহ নানা রোগের সৃষ্টি হয়। তাই এর থেকে সবাইকে সচেতন হওয়া উচিত। তামাক চাষ এবং এর পাতা পুড়িয়ে প্রক্রিয়াজাত করা অত্যন্ত ক্ষতিকর।

গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মতিয়র রহমান বলেন, ‘কৃষকদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার জন্য কাজ করছে উপজেলা কৃষি অফিস। কারণ, তামাক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তামাকের বিকল্প হিসেবে অন্য ফসল চাষ করে কীভাবে বেশি লাভবান হওয়া যায়, সে বিষয়ে আমরা সার্বক্ষণিক চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আসছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত