Ajker Patrika

এক যুগ পর ইছামতীতে বইঠার ঝড়, নৌকাবাইচে জনস্রোত

ঘিওর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি  
আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৩০
এক যুগ পর ইছামতীতে বইঠার ঝড়, নৌকাবাইচে জনস্রোত
রঙিন নৌকার ছুটে চলা দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘হেইও... হেইও...’ মাঝিদের সম্মিলিত হাঁক, বাঁশির তালে তালে বইঠার ছন্দ আর নদীর দুই পাড় থেকে ভেসে আসা হাজারো মানুষের করতালিতে মুখর হয়ে উঠেছে মানিকগঞ্জের ইছামতি নদী। দীর্ঘ এক যুগ পর নদীর বুকে নৌকাবাইচকে ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। রঙিন নৌকার ছুটে চলা দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে গতকাল শনিবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঞ্চনপুর ও বাল্লা ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। জনস্রোতের এই মিলনমেলা ভাঙে রাত ৯টার দিকে পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে।

প্রায় এক যুগ পর আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন এলাকার সাতটি ঘাসি ও তিনটি খেল্লা নৌকাসহ বিভিন্ন আকৃতি, রং ও বাহারি সাজের বেশ কয়েকটি নৌকা অংশ নেয়।

কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের কুশিয়ারচর এলাকা থেকে বাল্লা ইউনিয়নের খেরুপাড়া ঘাট পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ বাইচের জন্য নির্ধারণ করা হয়।

প্রতিযোগিতায় ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’, ‘সোনারচাঁন-২’, ‘গায়ান বাড়ি’, ‘গায়ান তরী’, ‘হাজারি তরী’, ‘দাদা-নাতি’, ‘মায়ের দোয়া’, ‘পঙ্খিরাজ’সহ বিভিন্ন চমকপ্রদ নামের নৌকা অংশ নেয়।

বাইচ শুরু হতেই নদীর দৃশ্য বদলে যায়। দুপাড়ের দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে টানটান উত্তেজনা। একসঙ্গে ছুটে চলা নৌকাগুলোর বইঠার আঘাতে নদীতে সৃষ্টি হতে থাকে ছোট ছোট ঢেউ। মাঝিদের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দর্শকদের উত্তেজনাও। কোনো নৌকা সামান্য এগিয়ে গেলে নদীর পাড় থেকে ওঠে উল্লাস। আবার প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা গতি বাড়ালে পাল্টে যায় সেই দৃশ্য। শেষ পর্যন্ত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ‘সোনারচাঁন-২’ চ্যাম্পিয়ন হয়।

এর আগে দুপুর থেকেই ইছামতীর দুই পাড়ে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে কেউ আসেন হেঁটে, কেউ ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও নৌযানে। নদীর পাড়ের পাশাপাশি মাঝনদীতেও অনেক দর্শনার্থী অবস্থান নেন। সবার চোখ তখন ছুটে চলা নৌকার দিকে। মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেও ব্যস্ত ছিলেন অনেকে।

ছয় বছরের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নৌকাবাইচ দেখতে আসা স্কুলশিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, ‘গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যই দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এসব দেখার সুযোগ কম পাচ্ছে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এমন আয়োজন দেখতে পেরে অনেক ভালো লাগছে।’

নদী, পরিবেশ ও প্রকৃতিবিষয়ক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারসিকের মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায় বলেন, একসময় বর্ষায় নদী-খাল-বিলবেষ্টিত গ্রামগুলোতে নৌকাবাইচ ছিল অন্যতম প্রধান বিনোদন ও লোকসংস্কৃতির অংশ। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের বিস্তার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে অনেক জায়গায় এ ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। দীর্ঘ বিরতির পর ইছামতীতে নৌকাবাইচ আয়োজন মানুষের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন করা উচিত।

রঙিন নৌকার ছুটে চলা দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
রঙিন নৌকার ছুটে চলা দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

আয়োজকদের অন্যতম ও কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মুসা বলেন, দীর্ঘদিন পর ইছামতী নদীতে নৌকাবাইচ হওয়ায় এলাকার মানুষের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। ভবিষ্যতে যাতে আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজন করা যায়, সে চেষ্টা করা হবে।

পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের অতিথি উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ জালাল বলেন, নৌকাবাইচ বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ। দীর্ঘ বিরতির পর আয়োজনে বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছে। প্রতিবছর এমন আয়োজন হলে ঐতিহ্যটি আরও প্রাণবন্ত হবে।

প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী নৌকার মালিক ও মাঝিদের হাতে নগদ অর্থ ও সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। এ সময় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

দীর্ঘদিন পর নৌকাবাইচ ঘিরে ইছামতীর দুই পাড়ে মানুষের উপস্থিতি ও উৎসাহে স্থানীয়দের মধ্যে প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত