Ajker Patrika

আজ বিশ্ব মা দিবস: অন্ধ মেয়েকে আগলে রেখেই কাটছে বৃদ্ধার জীবন

আয়শা সিদ্দিকা আকাশী, মাদারীপুর
আজ বিশ্ব মা দিবস: অন্ধ মেয়েকে আগলে রেখেই কাটছে বৃদ্ধার জীবন
কোমেলা বেগমকে খাইয়ে দিচ্ছেন তাঁর মা সোনাবান। ছবি: আজকের পত্রিকা

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের তালতলা এলাকার সামচু হাওলাদারের (৭৫) সঙ্গে একই এলাকার কেরামত আলীর মেয়ে সোনাবানের (৬০) বিয়ে হয় প্রায় ৪০ বছর আগে। বিয়ের পর তাঁদের সংসারে আসে তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। বর্তমানে এক ছেলে সৌদি আরবে থাকেন। আরেক ছেলে এবং তার স্বামী (ছেলের বাবা) কৃষিকাজ করেন। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায়। কিছুটা অভাবে থাকলেও মোটামুটি ভালোই যাচ্ছিল তাঁদের দিন।

বড় মেয়ে কোমেলা বেগম। বাবার সংসারে অভাবের কারণে মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাশের গ্রামের কুদ্দুস শেখ নামে এক ছেলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। শৈশব পেরিয়ে সবে কৈশোরে পা দেওয়া কোমেলার বিয়ের বছর না পেরোতেই তিনি অন্তঃসত্ত্বা। জন্ম দেন এক ছেলেসন্তানের। তখন তাঁর স্বামী কুদ্দুস শেখ একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন। ছেলে মাহামুদুল হাসান শেখকে নিয়ে স্বামীর সংসারেও অভাব কাটেনি কখনো।

এরপর কিছুদিন গড়াতেই নির্যাতনের শুরু। বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে চাপ দিতে থাকেন স্বামী কুদ্দুস শেখ। তবে দরিদ্র বাবার কাছ থেকে কিছু অর্থ আনার মতো অবস্থাই যে ছিল না কোমেলা সেটা ভালো করেই জানতেন। তাই নির্যাতন আর অপমানের মধ্যেই দিন চলতে থাকে। ছেলে মাহামুদুল হাসান শেখের বয়স যখন তিন বছর তখন তাঁর আরও একটি সন্তান পেটে আসে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় একদিন হঠাৎ ঘরের চৌকি থেকে পড়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন কোমেলা বেগম।

এই অসুস্থতা থেকেই কন্যাশিশু (দ্বিতীয় সন্তান) জন্মের পরপর তাঁর দুটি চোখের আলো নিভে যায়। ৯ মাস গর্ভধারণ করে মা হয়েও তাঁর ভাগ্যে জোটেনি মেয়েকে একবার দেখার। মেয়ের নাম রাখেন সুমাইয়া আক্তার। সুমাইয়া দেখতে কী রকম তা-ও তিনি জানেন না।

মেয়ের মাথায় তেল দিয়ে চিরুনি করে দিচ্ছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা
মেয়ের মাথায় তেল দিয়ে চিরুনি করে দিচ্ছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

এদিকে স্ত্রীর এই অন্ধ হওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি তাঁর স্বামী কুদ্দুস শেখ। একদিন সবার অজান্তেই অন্ধ স্ত্রী ও তাঁর দুই সন্তানকে ফেলে নিরুদ্দেশ হয়ে যান কুদ্দুস শেখ। প্রায় ৯ বছর পরে কোমেলা বেগম জানতে পারেন কুদ্দুস শেখ আরেক বিয়ে করেছেন। সেই ঘরে একটি কন্যাসন্তানও আছে। পরবর্তী সময়ে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে না পেরে কোমেলা বেগম নিজেই কুদ্দুস শেখকে ডিভোর্স দেন।

এরপর দুই সন্তান নিয়ে কোমেলা বেগম গিয়ে ওঠেন বাবার বাড়িতে। সেই থেকে সংগ্রামের নতুন ধাপ শুরু। অন্ধ থাকায় কোনো কাজ করতে পারেন না কোমেলা। নিজের সবকিছুই করে দিতে হয় মা সোনাবানকে। মায়ের বয়স এখন ৭০-এর কোঠায়। তবুও অন্ধ মেয়ের সেবা করেই সময় কাটে তাঁর। অন্ধত্বের কারণে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেও মেয়েকে ফেলতে পারেননি মা।

অভাবে তাড়নায় কোনো উপায় না পেয়ে কোমেলা বেগম মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে শুরু করেন। মাদারীপুর সদর উপজেলা শহর, তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় ১০-১১ কিলোমিটার দূরে। তবুও তিনি জীবিকার সন্ধানে শহরে আসতেন প্রতিদিন। মানুষের কাছে হাত পেতে যা পান তা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলে কোমেলা বেগমের।

দিনে দিনে ছেলে মাহামুদুল হাসানকে ঘিরে অসহায় কোমেলা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ছেলে মাহামুদুল হাসানকে পড়াশোনা করিয়ে বড় করতে হবে। চাকরি করবে। তাঁর আর কোনো অভাব থাকবে না। তাই তিনি মানুষের কাছে হাত পেতে টাকা সংগ্রহ করে ছেলেকে পড়াশোনা করান। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ছেলে এসএসসি পাস। তবে টাকার অভাবে কলেজে ভর্তি হওয়া যখন অনিশ্চিত, তখন কয়েকজন সাংবাদিক মিলে মাহামুদুলকে মাদারীপুর সরকারি কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন, বই কিনে দেন। সাংবাদিক রাহাতের কাছে কম্পিউটার শিখেন মাহামুদুল হাসান। তাঁর স্বপ্ন ভালোভাবে কম্পিউটার শিখে পড়াশোনার পাশাপাশি কম্পিউটারের দোকান দিয়ে মায়ের অভাব দূর করা। সেই সঙ্গে মায়ের চোখের চিকিৎসা করাবেন। মাকে আর কারও কাছে হাত পাততে দেবেন না। বোনকে মানুষের মতো মানুষ করবেন—এই ভাবনায় দিন-রাত ঘরে বসে বসেই কম্পিউটারে কাজ করতেন। সেভাবেই সে জীবনকে পরিশ্রমের মাধ্যমে গুছিয়ে নিচ্ছিল।

কিন্তু অসহায় মা কোমেলা বেগমের সেই স্বপ্ন নিমেষেই শেষ হয়ে যায় ২০১৯ সালের ২৬ জুন। একটি বিষধর সাপের ছোবলে কোমেলা বেগমের স্বপ্নের ইতি ঘটে। সকালে নিজের ঘরে কম্পিউটারে কাজ করার সময় টেবিলের নিচে পা পড়তেই বিষধর সাপ ছোবল দেয় মাহামুদুল হাসানকে। পরে প্রথমে তাঁকে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে, পরে বিকেল ৪টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান মাহামুদুল হাসান।

মা কোমেলা বেগম এই শোক কিছুতেই সইতে পারছিলেন না। ছেলের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। দেখা দেয় মানসিক সমস্যাও।

কিন্তু মা যে সন্তানকে ফেলে দিতে পারেন না। অন্ধ হলেও কোমেলা বেগমকে নিয়েই মা সোনাবানের এখন দিনক্ষণ কাটে। মা-মেয়ে দুজনেই যেন একে অপরের জন্যই বেঁচে আছেন। তবে সোনাবানের বয়স হয়েছে। এক ছেলে বিদেশ থাকেন। আরেক ছেলে আলাদা সংসার গড়েছেন। তাই সোনাবান এখন তাঁর স্বামী সামচু হাওলাদার ও মেয়ে কোমেলাকে নিয়েই থাকেন। তবে স্বামীও যে সুস্থ নেই তাঁর। তিনি ক্যানসার আক্রান্ত। চিকিৎসা করাতে গিয়ে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না।

অন্ধ কোমেলা বেগম বলেন, ‘আমি চোখে দেখতে পারি না। নিজে একা একা কিছুই করতে পারি না। আমার মা সবকিছু করে দেন। আমাকে খাইয়ে দেন, গোসল করিয়ে দেন, এমনকি টয়লেটে গেলেও তিনি হাত ধরে দিয়ে আসেন। আমার মা না থাকলে আমার কী হতো তা আল্লাহই জানে। স্বামী আমাকে ছেড়ে গেলেও মা আমাকে আগলে রেখেছেন।’

অন্ধ কোমেলা বেগমের মা সোনাবান বলেন, ‘আমার বড় সন্তান এই কোমেলা। ছোটবেলায় যেভাবে যত্ন করতে হয়েছে, এখনো সেই একইভাবে যত্ন করতে হয়। আমি মা, মা তো সবার আগে। মা কখনো সন্তানের কষ্ট সইতে পারে না। তাই আমি যত দিন বেঁচে আছি এই সন্তানকে নিয়েই থাকতে চাই।’

মাদারীপুরের সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আফজাল হোসাইন বলেন, ‘কোমেলা বেগম যেহেতু অন্ধ, প্রতিবন্ধী, আর তাঁর মা বৃদ্ধ। তাই তাঁরা যদি প্রতিবন্ধী ভাতা ও বয়স্ক ভাতা না পেয়ে থাকেন, তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। কোমেলার বাবা ক্যানসার আক্রান্ত হলে, তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সমাজসেবা অধিদপ্তরে দরখাস্ত করলে, তা যাচাই-বাছাই করে সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রশাসনের সভায় এমপির বউ, ইউএনও-এসি ল্যান্ড বদলি

কিশোরগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার স্ত্রীর লাশ উদ্ধার

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা না বাড়াতে উপসাগরীয় মিত্রদের সৌদির ‘গোপন বার্তা’

মার্কিন বাহিনীতে আক্রমণের কোনো পরিকল্পনা ছিল না ইরানের: কংগ্রেসকে পেন্টাগন

ভুলবশত ৩টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে কুয়েত: মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত