Ajker Patrika

মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন: তিস্তা নিয়ে আবারও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি

  • বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে
  • অন্তর্বর্তী সরকারও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল, তবে কাজ এগোয়নি
  • এবার প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চান তিস্তাপারের মানুষ
খোরশেদ আলম সাগর, লালমনিরহাট
মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন: তিস্তা নিয়ে আবারও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি
ফাইল ছবি

উত্তরের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা তিস্তা নদীকে পুঁজি করা হচ্ছে এবারের নির্বাচনেও। বিগত নির্বাচনগুলোর মতোই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণার প্রতিশ্রুতির শীর্ষে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। অন্তর্বর্তী সরকার একই প্রতিশ্রুতির বুলি আওড়ালেও কার্যত কোনো পদক্ষেপই নেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার। ফলে নির্বাচনী এসব প্রতিশ্রুতিতে খুব বেশি আশাবাদী নন তিস্তাপারের মানুষেরা।

ভারতের সিকিম থেকে উৎপত্তি লাভ করে সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তিস্তা নদী। বাংলাদেশ অংশের উজানে গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার পানি এক তরফা ব্যবহার করছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করেও ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ভারত সরকার বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি বাংলাদেশ অংশ ছেড়ে দিলে ভোগে উত্তরাঞ্চলের মানুষেরা। অপর দিকে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধার জন্য পানিও দেওয়া হয় না।

অন্যদিকে খনন না করায় তিস্তা নদীর তলদেশ ভরাট হয়েছে। কার্যত কোনো উপকারে আসছে না তিস্তা নদী। তাই তিস্তা নদী খনন করে দুই তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে পানি শাসনের মাধ্যমে তিস্তার বুকে কৃষিবিপ্লব ঘটানোর দাবি স্থানীয়দের দীর্ঘ দিনের দাবি। ’৯০ দশকের পর থেকে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে সব প্রার্থী তিস্তা নদীর বাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট আদায় করে ক্ষমতায় গেলেও তিস্তাপারের কোনো উন্নতি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলেও প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নের শূন্যতা, পূর্ববর্তী সরকার আমলে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি বৃহৎ মহাপরিকল্পনার ঘোষণা আসে। তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং অগ্রাধিকার সংকটে সেই পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

এবারের নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির পক্ষ থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ২৩ জানুয়ারি একই রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

এসব প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নন তিস্তাপারের মানুষেরা। লালমনিরহাটের চর হলদিবাড়ির প্রবীণ তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘সবাই তিস্তা নিয়ে রাজনীতি করেছে, তিস্তাপারের মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চাই।’

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন এই নদী পারের মানুষেরা। গত বছরের অক্টোবরে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটি একই সঙ্গে কয়েকটি জেলায় টানা ৪৮ ঘণ্টা তিস্তাপারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিস্তা মহাপরিকল্পনা আবারও আলোচনায় আসে।

তখন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আশ্বাস দিয়েছিলেন, নির্বাচনের আগে জানুয়ারির শুরুতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।

নির্বাচন এলেও এল না তিস্তার সুখবর। নতুন করে আশার আলো দেখলেও বাস্তব সিদ্ধান্ত, বাজেট বরাদ্দ কিংবা স্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো ঘোষণা হয়নি। ফলে তিস্তাপারের মানুষ প্রশ্ন তুলছেন ‘প্রতিবার ভোট আসে, প্রতিশ্রুতি আসে, কিন্তু তিস্তার দিন বদলায় না কেন? অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অটুট দাবি। আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন দেখতে চান তাঁরা।’

লালমনিরহাটের গোবর্দ্ধন গ্রামের কৃষক আজিজার বলেন, ‘ভোট এলে সবার মুখে তিস্তা নদীর প্রতিশ্রুতি শুনি বাহে। ভোট শেষ হলে সগে শেষ। এবার দেশটা স্বাধীন হলো, ভেবেছিলাম এবার অন্তত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। হামারগুলার দুঃখ ঘুচপে। কিন্তু না, সবাই খালি প্রতিশ্রুতি দেয়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর সিদ্ধান্ত ছাড়া এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন অসম্ভব। তিস্তা আজও অপেক্ষায়; প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতায় যাওয়ার, রাজনীতি থেকে পরিকল্পনায় ফেরার, আর দীর্ঘ ধোঁয়াশা কাটিয়ে জীবনের নদী হয়ে ওঠার।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রয়োজনে ইরান থেকে নিজেদের বিজ্ঞানীদের সরিয়ে নিতে প্রস্তুত রাশিয়া

ইরানে মার্কিন হামলার ৭ সম্ভাব্য পরিণতি

স্কুলছাত্রকে হত্যা: ফেনীতে ছাত্রদল কর্মীসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

তেহরান পুড়লে জ্বলবে রিয়াদও, ইরানের অস্তিত্বের লড়াই যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্যনিয়ন্তা

গণভোটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট চাওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ: ইসি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত