Ajker Patrika

কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতি ও হাসপাতাল: অনিয়মে রুগ্‌ণ সেবাপ্রতিষ্ঠান

  • কেনা জমি ৮২ লাখ ৩ হাজার ৮৫০ টাকা কমে বিক্রি
  • আয়কর বাবদ বকেয়া প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা
  • ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার বিল-ভাউচার মেলেনি
  • ২৫ লাখে চুক্তি হলেও পরিশোধ ৩৮ লাখ টাকা
  • প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছে: সম্পাদক
দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ, কুমিল্লা 
কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতি ও হাসপাতাল: অনিয়মে রুগ্‌ণ সেবাপ্রতিষ্ঠান
ছবি: সংগৃহীত

গত এক দশকে এমন কোনো অনিয়ম নেই, কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতি ও তাদের পরিচালিত ডায়াবেটিক হাসপাতালে ঘটেনি। সমিতির জমি কেনাবেচা, সংস্কারকাজ, সফটওয়্যার প্রকল্প, ফার্মেসি পরিচালনা এবং কর ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে বার্ষিক প্রতিবেদনে। এ ছাড়া কোথাও বিল-ভাউচার ছাড়া নগদ অর্থ উত্তোলন, কোথাও আবার কোটি টাকার প্রকল্পে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই অর্থ পরিশোধ—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটিতে অনিয়ম-দুর্নীতির ছড়াছড়ি। এসব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সমিতির সাধারণ সদস্যরা।

অনিয়ম-দুর্নীতির এই চিত্র উঠে আসে কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতির ৩৭তম বার্ষিক সাধারণ সভায়। গত শুক্রবার বিকেলে হাসপাতালের ডা. যোবায়দা হান্নান মিলনায়তনে এ সভা হয়। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বার্ষিক প্রতিবেদনে বিগত পরিচালনা পর্ষদের সময়কার অনিয়ম ও অডিট আপত্তির বিস্তারিত তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ডায়াবেটিক হাসপাতালের অন্তঃবিভাগের নিচতলায় সমিতির নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত একটি ফার্মেসি রয়েছে। ওষুধ ক্রয়, মজুত ও বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল। ২০০৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অডিট প্রতিবেদনে ফার্মেসি সংশ্লিষ্ট হিসাবে মোট ১০ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৬ টাকার আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। একই সঙ্গে সমিতি পাঁচ বছর ধরে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং কর পরিশোধ করেনি। সিটি করপোরেশনের কর বকেয়া বাবদ সমিতির দেনা জমেছে ২৯ লাখ ৬৩ হাজার ৬২৫ টাকা।

কমে দামে জমি বিক্রি

ডায়াবেটিক সমিতির সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো নগরের বাগিচাগাঁও এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘আনন্দ কুটির’ বাড়ি বিক্রি। নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের লক্ষ্যে ২০১৪ সালে ১১ দশমিক ৪৬ শতক জমিটি কেনা হয়। ২০১৬ সালে কয়েক ধাপে ৬ কোটি ১৫ লাখ ২৩ হাজার ৮৫০ টাকা পরিশোধ করে দলিল সম্পন্ন করা হয়। তবে ২০২১ সালে ওই জমি মাত্র ৫ কোটি ৩৩ লাখ

২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয় তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ। এতে সমিতির সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয় ৮২ লাখ ৩ হাজার ৮৫০ টাকা।

এদিকে কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতির আয়কর বাবদ বকেয়া প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা। বিষয়টি বর্তমানে আয়কর ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এই মামলা সমিতির আর্থিক অবস্থাকে আরও চাপে ফেলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সফটওয়্যার প্রকল্পে অনিয়ম

ডায়াবেটিক সমিতি ও হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে ‘ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম অটোমেশন সফটওয়্যার’ প্রকল্প নেওয়া হয়। ১৫টি মডিউল সমন্বিত এই প্রকল্পের জন্য ২৫ লাখ টাকায় একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। তবে অডিট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাস্তবে ওই প্রতিষ্ঠানকে মোট ৩৮ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪২ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মো. কোরাইশি ও কোষাধ্যক্ষ প্রবাল শেখর মজুমদারের মৌখিক নির্দেশে বিভিন্ন তারিখে কোনো বিল বা ভাউচার ছাড়াই হিসাব বিভাগ থেকে নগদ অর্থ দেওয়া হয়। অথচ সফটওয়্যারের কাজ এখনো শেষ হয়নি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতির সাবেক পৃষ্ঠপোষক, কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার।

এ বিষয়ে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বলেন, আইটি বিশেষজ্ঞ দিয়ে যাচাই করে আমরা মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ পেয়েছি। বাকি কাজের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

মেলে না হিসাব

২০২৪ সালের ২৩ জুন সংস্কারকাজের নামে কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতি ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ ৯৫৬ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখায়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনে এই ব্যয়ের বিপরীতে কোনো গ্রহণযোগ্য বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত আট ধাপে ২১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টাকা এবং একই বছরের ১৫ জুন থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত সাত ধাপে আরও ২০ লাখ ২৮ হাজার ৪০০ টাকা হিসাব বিভাগ থেকে নগদ উত্তোলন করা হয়। মোট ৪১ লাখ ৯৮ হাজার ৯০০ টাকার এই ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কোনো যথাযথ বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বলেন, ‘পদে পদে অনিয়ম হয়েছে, যার প্রমাণ আমরা অডিট আপত্তিতে পেয়েছি। এই প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছে।’

সমিতির সহসভাপতি ও আইনজীবী কাইমুল হক রিংকু বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা ধীরে ধীরে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছি। যেসব বিষয়ে অভিযোগ ও অডিট আপত্তি এসেছে, সেগুলোর আইনগত দিক গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রয়োজনে ইরান থেকে নিজেদের বিজ্ঞানীদের সরিয়ে নিতে প্রস্তুত রাশিয়া

ইরানে মার্কিন হামলার ৭ সম্ভাব্য পরিণতি

স্কুলছাত্রকে হত্যা: ফেনীতে ছাত্রদল কর্মীসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

তেহরান পুড়লে জ্বলবে রিয়াদও, ইরানের অস্তিত্বের লড়াই যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্যনিয়ন্তা

গণভোটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট চাওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ: ইসি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত