Ajker Patrika

তিনবিঘা করিডরে বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক, ভারতীয় বিধায়কের বিতর্কিত মন্তব্য

আজিনুর রহমান আজিম, পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) 
তিনবিঘা করিডরে বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক, ভারতীয় বিধায়কের বিতর্কিত মন্তব্য
গতকাল সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে বিজিবি-বিএসএফ অস্ত্র তাক করে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম তিনবিঘা করিডর সীমান্তের শূন্যরেখায় বিএসএফের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা ও বিজিবি-বিএসএফের মধ্যকার উত্তেজনার ঘটনায় উভয় বাহিনীর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরে তিনবিঘা করিডর সড়কের পাশে বিএসএফের সভাকক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে সীমান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষে তীব্র বাদানুবাদ হলেও একই দিন সকালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেখলিগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক দধিরাম রায়ের দেওয়া একটি উসকানিমূলক মন্তব্যে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

আজ সকালে উত্তেজনার খবর পেয়ে তিনবিঘা করিডরে আসেন পশ্চিমবঙ্গের মেখলিগঞ্জের বিধায়ক দধিরাম রায়। তিনি সেখানে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে ভারতীয় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ‘সীমান্ত আইন বা বাংলাদেশের আপত্তি যা-ই থাক না কেন, ভারতের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ বন্ধ হবে না।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিধায়ক দধিরাম রায়কে বলতে শোনা যায়, ‘খবর পেয়ে সকালে এখানে আসলাম। বিএসএফের আধিকারীদের সাথে কথা বললাম। পরিষ্কার কথা হচ্ছে, কাজ অনগোয়িং প্রসেসে (চলমান প্রক্রিয়ায়) আছে। কাজ বন্ধ হবে না। পতাকা মিটিংয়ের মাধ্যমে আলোচনা চলতে থাকবে, কাজও চলতে থাকবে। গভর্নমেন্টের যা অর্ডার আছে, রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনে যা আছে, সেভাবেই কাজ হবে। বাংলাদেশ কী বলল, কী না বলল সেটা তাদের বিষয়। ভারত সরকার যা নির্দেশ দিয়েছে সে অনুযায়ীই কাজ হবে। পশ্চিমবঙ্গে এখন ডাবল ইঞ্জিনের সরকার চলছে। কোনো সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষকে ভয় পাওয়ার কোনো বিষয় নেই। মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত থাকবে।’

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের প্রধান পিলার ডিএএমপি ৭-এর ১২ নম্বর সাবপিলারের পাশে তিনবিঘা করিডর এলাকা থেকে ভারতের ২০ গজ অভ্যন্তরে বিএসএফের আহ্বানে এই বৈঠক বসে। বৈঠকে ভারতের পক্ষে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ১৭৪ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট ভিনোদ রেধু ও ৩০ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট এস নারায়ণ মিশরা। বাংলাদেশের পক্ষে সাত সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রংপুর-৫১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আলোচনার শুরুতেই বিএসএফ কমান্ড্যান্ট বিজিবির গত শুক্রবারের মুখোমুখি অবস্থানের সমালোচনা করেন। বিএসএফ দাবি করে, শূন্যরেখা থেকে ৫০ গজের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করতে ৩ ফুটের ছোট বাঁশের খুঁটি স্থাপন করা হয়েছিল, যা ছোট একটি বিষয়। কিন্তু এটিকে কেন্দ্র করে বিজিবির কোম্পানি কমান্ডার যেভাবে অস্ত্র কক (ফায়ারিংয়ের জন্য প্রস্তুত) করে পজিশন নিয়েছেন, তা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক।

বিএসএফের এই বক্তব্যের কড়া জবাব দেন বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো ধরনের স্থাপনা বা কাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। বিএসএফ আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে এবং বিজিবির বাধা উপেক্ষা করে জোরপূর্বক খুঁটি স্থাপন করছিল। এই অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই বিজিবি নিয়ম মেনে অস্ত্র কক করে ফায়ারিং পজিশনে গিয়েছিল।’

পরে বিএসএফ অভিযোগ তোলে, কিছু বাংলাদেশি নাগরিক ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ভারতীয় নাগরিকদের চাষাবাদ নষ্ট করছেন। এর জবাবে বিজিবি অধিনায়ক বলেন, ‘আমাদের কোনো নাগরিক যদি ভারতের ভেতর অবৈধভাবে প্রবেশ করেন, তবে আপনারা তাঁকে আটক করে আমাদের কাছে বুঝিয়ে দিন, আমরা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর বিচার করব। আর যদি কোনো বাংলাদেশির কারণে চাষাবাদ নষ্ট হয়ে থাকে, তবে আমরা তাঁর জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। আপনারা কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতেই পারেন, তাতে আমাদের সমস্যা নেই। কিন্তু নিচে পাকা করে যেকোনো ধরনের স্থায়ী কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে হলে তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন মেনে সীমান্ত থেকে ১৫০ গজের বাইরে দিতে হবে।’

এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনবিঘা করিডরের শূন্যরেখার মাত্র ১০ থেকে ২০ গজের মধ্যে বিজিবিকে না জানিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাঁশের খুঁটি পোঁতা শুরু করেন বিএসএফের ১৭৪ ব্যাটালিয়নের ভীম ক্যাম্পের প্রায় ৮০ জন সশস্ত্র সদস্য। বিজিবি বাধা দিলেও তা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ায় পানবাড়ী কোম্পানির কমান্ডার সুবেদার সোলেমান আলীর নেতৃত্বে বিজিবি চার থেকে পাঁচটি সেকশনে ভাগ হয়ে ভারী অস্ত্র তাক করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যার মুখে বিএসএফ পিছু হটে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিবি রংপুর-৫১ ব্যাটালিয়নের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গতকালের বিজিবির সেই রণপ্রস্তুতি ও অনড় অবস্থানের কারণে বিএসএফের শীর্ষ কর্মকর্তারা আজকের বৈঠকে কিছুটা নরম সুর অবলম্বন করেন। তাঁরা বিজিবিকে সীমান্তে অতটা ‘অ্যাগ্রেসিভ’ বা আক্রমণাত্মক না হওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন।

জবাবে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে যদি শূন্যরেখায় কোনো ধরনের কাজ করার প্রয়োজনও হয়, তবে তা হঠাৎ করে বিজিবিকে না জানিয়ে করা যাবে না। যেকোনো কাজের আগে অবশ্যই অফিশিয়ালি বিজিবি-বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈঠক ও হস্তক্ষপের মাধ্যমে লিখিত অনুমতি নিতে হবে। বিএসএফ কমান্ড্যান্টরা বিজিবির এই শর্তে একমত পোষণ করেছেন এবং বর্তমানে সীমান্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জামায়াত নেতার ডাকা খেয়াঘাট দখলে নিলেন বিএনপির আহ্বায়ক

তেল বেচতে ভারতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্য ও কূটনীতির জট খুলবে কি

চীনে কয়লাখনিতে বিস্ফোরণে নিহত ৯০, এক দশকের মধ্যে সর্বাধিক প্রাণহানির রেকর্ড

যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদনকারীদের ফিরতে হবে নিজ দেশে

কোরবানির গরু হাটে হঠাৎ জ্ঞান হারালে করণীয় কী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত