Ajker Patrika

তেল বেচতে ভারতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্য ও কূটনীতির জট খুলবে কি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ১১: ৩৪
তেল বেচতে ভারতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্য ও কূটনীতির জট খুলবে কি
কলকাতায় নেমেই মাদার তেরেসা হাউসে যান মার্কো রুবিও। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই চার দিনের সফরে আজ শনিবার সকালে ভারতে এসে পৌঁছেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। আজ সকালে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় এসে পৌঁছান। তাঁর এই ব্যস্ততম সফরের তালিকায় কলকাতা ছাড়াও রয়েছে নয়াদিল্লি, জয়পুর ও আগ্রা।

নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলার পর থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ভঙ্গুর শান্তি আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরান এই প্রণালি বন্ধের কৌশল বেছে নিয়েছে।

এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম ভারত। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার এই দেশটিকে রান্নার গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যসহ দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করতে হয়।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ভারতের এই সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের কাছে যতটা সম্ভব জ্বালানি বিক্রি করতে চাই। আপনারা দেখছেন যে, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি ঐতিহাসিক পর্যায়ে রয়েছে।’

তবে বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি করা ভারতের জন্য অত্যন্ত দীর্ঘপথ এবং ব্যয়বহুল হবে। ফলে বর্তমান ঘাটতি মেটাতে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা দিল্লির জন্য যৌক্তিক হবে না।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) মার্কিন শিক্ষা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিনীত প্রকাশ বলেন, ‘ইরান পরিস্থিতির দ্রুত কোনো সমাধান হচ্ছে না, তাই এই সফরে “জ্বালানি নিরাপত্তা” সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ থিম হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ভারতকে রুশ তেল কেনার বিষয়ে বিশেষ ছাড় দিয়েছে, তবে দিল্লি এই সফরে আরও বেশি কিছু সুবিধা বা ছাড় আদায় করতে চাইবে।’

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধি পেলে তা দুই দেশের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে। ভারতের পক্ষে থাকা এই বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৫৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

চলতি বছরের শুরুতে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য অচলাবস্থার অবসান ঘটে। ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরবর্তীতে আদালতের এক রায়ের পর ১০ শতাংশ-এ নেমে আসে। শুল্ক হ্রাসের এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা স্বস্তি পেয়েছেন।

এর বিপরীতে, ভারত গত ফেব্রুয়ারিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি, উড়োজাহাজ, প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে একটি চূড়ান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির খসড়া নিয়ে দুই দেশের আলোচনা চলছে।

তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা এই বিশাল অঙ্কের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ব্রাউনসভিলে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তেল শোধনাগারে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিনিয়োগের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর থেকে ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছেন।

শুল্ক নিয়ে টানাপোড়েন সত্ত্বেও, ২০২৬ সালের মার্চে সমাপ্ত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি প্রায় স্থিতিশীল থেকে ৮৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের অজয় শ্রীবাস্তব জানান, উচ্চ শুল্ক থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি বার্ষিক ভিত্তিতে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাকিস্তান ও ইরান ইস্যুতে দিল্লির অস্বস্তি

রুবিও-র এই সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পেছনে পাকিস্তান ও ইরান নীতি নিয়ে কিছু চাপা উত্তেজনা চলছে। গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার একটি সংক্ষিপ্ত সংঘাত নিরসনে ট্রাম্প মধ্যস্থতা করেছিলেন বলে বারবার দাবি করলেও, দিল্লি বরাবরই তা প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। ভারতের স্পষ্ট নীতি হলো—কাশ্মীর বা দ্বিপক্ষীয় কোনো বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা গ্রহণযোগ্য নয়।

পাশাপাশি, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ট্রাম্পের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে সম্বোধন করা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার ভূমিকা ওয়াশিংটন ও ইসলামবাদকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, যা দিল্লিকে কিছুটা অসন্তুষ্ট করেছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সফরে রুবিও জনসমক্ষে পাকিস্তান নিয়ে কোনো মন্তব্য করা এড়িয়ে চলবেন এবং দিল্লির নেতাদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

অন্যদিকে, ইরান সংকটে ভারতকে সামরিক সম্পৃক্ততার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের আহ্বান সত্ত্বেও দিল্লি কেবল কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায়।

কোয়াড ও ব্রিকস সমীকরণ

আগামী ২৬ মে নয়াদিল্লিতে কোয়াড (ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে মার্কো রুবিও যোগ দেবেন। চলতি বছরের শেষের দিকে ভারতের রাজধানীতে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, চীনকে মোকাবিলায় প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প কোয়াড নিয়ে অতি-উৎসাহী থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোয়াড কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে, যেখানে চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলো অংশ নেবে। এই অবস্থায় ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় রুবিও-র এই সফর দিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ঝিনাইদহে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা, অভিযোগের বিষয়ে যা বলছে বিএনপি

এজেন্সির প্রতারণা: রাশিয়ায় গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত ৩ বাংলাদেশি

আগামীকাল থেকেই বন্ধ প্রাথমিক বিদ্যালয়

যুবদল ও ছাত্রদলের ৮ নেতা-কর্মীর নামে মামলা দিয়ে ঝিনাইদহ ছাড়লেন পাটওয়ারী

পদত্যাগ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত