Ajker Patrika

হাওরাঞ্চলে মাছ শিকার: নিষেধাজ্ঞা মানছেন না হাওরের জেলেরা

  • প্রথমবার হাওরে এক মাস মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা
  • নগদ প্রণোদনা ও খাদ্যসহায়তা চান জেলেরা
  • ৩৩ হাজার ১৯০ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন
  • জীবিকার জন্য বিকল্প পেশা নাই জেলেদের
মো.ফরিদ রায়হান, অষ্টগ্রাম
হাওরাঞ্চলে মাছ শিকার: নিষেধাজ্ঞা মানছেন না
হাওরের জেলেরা
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলায় হাওরে মাছ ধরছেন জেলেরা। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা মানছেন না জেলেরা। তাঁরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা মানতে চান। এ জন্য বিকল্প পেশার ব্যবস্থার পাশাপাশি সরকারের নগদ প্রণোদনা ও খাদ্যসহায়তা দেওয়া দরকার বলে জানান তাঁরা।

উপকূলীয় অঞ্চলের মতো কিশোরগঞ্জ হাওরাঞ্চলে এবার ‘মৎস্য প্রজনন মৌসুমে’ প্রথমবার এক মাসব্যাপী মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। ২৮ মে থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, নদনদী ও ভাসান পানিতে সব প্রজাতির মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

জেলে ও মৌসুমি জেলেরা জানান, মাছ ধরে হাট-বাজারে বিক্রি করে সংসার চালান তাঁরা। নেই অন্য কোনো পেশা। মাছ ধরা বন্ধ করলে না খেয়ে থাকতে হবে। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া, চিকিৎসাসহ সব খরচের টাকা এই মাছ বিক্রিতে আসে। এক ফসলি হাওরাঞ্চলে জেলেদের পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকেরা বোরো ধান কাটা শেষে বর্ষা মৌসুমে হাওরে মাছ ধরে নিজেদের খাদ্যচাহিদা পূরণ ও পরিবারে দৈনন্দিন খরচ মিটানোর একমাত্র উৎস মাছ শিকার ও বিক্রি। খাদ্যসহায়তা ও প্রণোদনা ছাড়া এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন জেলেরা।

হাওরাঞ্চলের তিন উপজেলায় নিষিদ্ধ সময়ে মাছ শিকার না করতে হাট-বাজার ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন ও মাইকিং প্রচারণা এবং অভিযান পরিচালনা করছে মৎস্য বিভাগ।

অষ্টগ্রাম উপজেলার কলমা ইউনিয়নের জেলে বিশ্ব চন্দ্র দাস (৫৫) বলেন, ‘মাছ ধরা বন্ধ রাখলে তো পেটের খিদা বন্ধ থাকবে না। আমরা সরকারি নিষেধ মানতে চাই, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার সাহায্য না দিলে আমরা চলতে পারব না।’

মিঠামইন উপজেলার কাটখাল ইউনিয়নের জেলে আমির হোসেন (৪২) বলেন, ‘আমরা সরকারি আইন মানতে বাইধ্য। তয় সরকারেরও সমানভাবে আমাদের সাহায্য করতে হবে। এক মাস মাছ না ধরলে, খামু কী? বউ পোলাপান নিয়ে এই মাছ বেচার ট্যাকায় চলি।’

সংশ্লিষ্ট মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ হাওরাঞ্চলে ৩৩ হাজার ১৯০ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। তার মধ্যে অষ্টগ্রামে ৮ হাজার ৭৭৯, ইটনায় ১২ হাজার ৯৩৪, ও মিঠামইনে ১১ হাজার ৪৭৭ জন। স্থানীয়দের মতে, মৌসুমি জেলেসহ তিন উপজেলায় জেলের সংখ্যা হিসাবের চেয়ে আরও ১০ থেকে ১২ হাজার বেশি হবে।

হাওর উন্নয়নবিষয়ক সামাজিক সংগঠন ‘হাওর অঞ্চলবাসী’র সম্পাদক কামরুল হাসান বাবু বলেন, এক মাস মৎস্য শিকার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে হাওরাঞ্চলে মা মাছ, পোনা মাছ সংরক্ষণ ও মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি এবং খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার হবে। তবে জেলেদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। এবার হাওরাঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানির ফলে এমনিতে জেলে ও মৌসুমি জেলেদের জীবনযাপন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। তাই, মাছ ধরা নিষিদ্ধ সময়ে সরকারের ‘উপকূলীয় মডেলে’ জেলেদের জন্য খাদ্য ও নগদ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। এতে জেলেরা আর্থিকভাবে সুরক্ষা পাবে, নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে উৎসাহিত হবে।

ইটনা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজীব দাস বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনায় নিষিদ্ধ সময়ে মাছ না-ধরতে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বেগ পেতে হচ্ছে। নিষিদ্ধ সময়ে জেলেরা বেকার থাকলে তাঁদের জীবিকার্জন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই সরকারি খাদ্যসহায়তা বা প্রণোদনার ব্যবস্থা দাবি করছেন মৎস্যজীবীরা।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত