Ajker Patrika

কিশোরগঞ্জে বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ডুবল হাওরের ৮৪৫ হেক্টর জমির বোরো

কিশোরগঞ্জ ও অষ্টগ্রাম প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জে বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ডুবল হাওরের ৮৪৫ হেক্টর জমির বোরো
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের হাওরে টানা বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া ধান কাটছেন কৃষকেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলায় বিস্তীর্ণ হাওরের বোরো ধান তলিয়ে গেছে। কৃষকের চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে হাড়ভাঙা খাটুনি ও ঋণের টাকায় ফলানো স্বপ্নের ধান। প্রকৃতি যেন সব তাঁদের সব হিসাবনিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে। যে হাওরের নতুন ধানে বাড়িতে বাড়িতে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই কান্না আর অনিশ্চয়তার কালো মেঘ।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৮৪৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে অষ্টগ্রামে ৪৭০ হেক্টর, ইটনায় ২৫৩ হেক্টর, মিঠামইনে ১০০ হেক্টর, বাজিতপুরে ১২ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ১০ হেক্টর বোরো ধান ডুবে গেছে। যদিও কৃষকেরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।

জানা গেছে, জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আবদুল্লাহপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের হাওরে অন্তত দুই হাজার হেক্টর বোরো জমির পাকা ধান এখন পানির নিচে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, অষ্টগ্রামে ৪৭০ হেক্টর ধান অতিবৃষ্টির কারণে পানিতে ডুবে আছে।

সীমান্তবর্তী হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার শিবপুর ও মাদনা এলাকায় আরও ৫০০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যেখানে দু-এক দিনের মধ্যে ধান কাটার কথা ছিল, সেখানে এখন গলাপানিতে নেমে কৃষকদের মরিয়া হয়ে ধান কাটতে দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বৈরাটি ও ঢাকী ইউনিয়নের তিনটি হাওরের ১০০ হেক্টর জমি ও ইটনা উপজেলার ধনপুর, চৌগাঙ্গা ও সদর ইউনিয়নের একাধিক হাওরে ২৫৩ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যে পানি নেমে না গেলে এসব জমির ধান কাটা সম্ভব হবে না। পানি না সরলে দ্রুত পচন ধরবে এসব ধানগাছে। এ ছাড়া অতিবৃষ্টির কারণে বাজিতপুরে ১২ হেক্টর, সদর উপজেলায় ১০ হেক্টরসহ জেলায় ৮৪৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে।

মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল ইসলাম খান অপু বলেন, অতি বর্ষণের কারণে হাওরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের জমিগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। মিঠামইনের শতাধিক হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। দ্রুত পানি সরে না গেলে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

সোমবার রাতে অতিবৃষ্টির কারণে আগে থেকে কাটা ও মাড়াই করা কয়েক শ হেক্টর জমির ধান শুকানোর জন্য মাঠে রাখা ছিল। অতিবৃষ্টিতে পানি জমে সেসব ধান তলিয়ে গেছে।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় ভরে বাড়িতে নিচ্ছেন কৃষক। ছবি: আজকের পত্রিকা
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় ভরে বাড়িতে নিচ্ছেন কৃষক। ছবি: আজকের পত্রিকা

আবদুল্লাপুর হাওরে ১০ একর জমিতে আবাদ করা রতন মিয়ার (৬৫) চোখে শুধুই অন্ধকার। মহাজনের ঋণের টাকা কীভাবে শোধ হবে আর সারা বছর পরিবার কী খাবে—সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি। একই দশা কাবিল মিয়ার। আধা পাকা কালো হয়ে যাওয়া ধান হাতে নিয়ে তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে ধান নষ্ট অইয়া যাইতাছে, কইলজাডারে মানাইতে পারতেছি না।’

স্থানীয়দের মতে, নদী ভরাট হওয়া ও ফসল রক্ষা বাঁধের ত্রুটির কারণেই এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। খোয়াই নদ দিয়ে উজানের পানি লাখাই উপজেলার মাদনা হয়ে কালনী নদীতে প্রবাহিত হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে কালনী নদী ভরাট হয়ে পানিশূন্য। শুষ্ক মৌসুমে এই নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করেন স্থানীয় জেলেরা। তাই খোয়াই নদের পানি ভরাট কালনী নদী দিয়ে নামতে পারছে না, ফলে প্রতিবছরই অষ্টগ্রাম ও খয়েরপুর-আবদুল্লাহপুর এলাকার অংশে বিপর্যয় নামছে।

চলতি ২০২৬ মৌসুমে কিশোরগঞ্জ জেলায় ধান সংগ্রহের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জেলা খাদ্য বিভাগ। ৩ মে থেকে শুরু হবে ধান ক্রয়। তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় মোট ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৩০ টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ইটনা (৩ হাজার ৪৭ টন) এবং অষ্টগ্রাম (২ হাজার ৫৭০ টন) উপজেলায়।

নিকলী আবহাওয়া কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক আক্তার ফারুক জানান, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন সোমবার ২৪ ঘণ্টায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। বুধবারও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, অতিবৃষ্টিতে হাওরের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে ইটনায় ২৭ সেন্টিমিটার ও চামড়াঘাটে ৭ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, ধানগাছ ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে। এর আগে পানি নেমে গেলে ক্ষতি কম হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত