খুলনায় চাঁদার দাবিতে একের পর এক প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, হুইপ বকুলের উদ্বেগ

খুলনা নগরে চাঁদার দাবিতে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও ওষুধের দোকানে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। ভয়ে ভুক্তভোগীদের অনেকে থানায় অভিযোগ বা মামলা করছেন না বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল।
আজ রোববার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কর্মকর্তারা আছেন, হয় তাঁরা এ সমস্যার সমাধান করবেন, না হয় তাঁরা আত্মসমর্পণ করে চলে যাবেন। এর কোনো বিকল্প নেই।
চাঁদার দাবিতে হুমকির পর ১২ দিন ধরে নগরের টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের চয়নিকা ফার্মেসি বন্ধ রয়েছে। ভয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পারছেন না এবং মামলাও করেননি। ভাঙচুরের শিকার সন্ধানী ক্লিনিক, নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, আব্দুল্লাহ প্যাথলজিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও মামলা করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৪ অক্টোবর রাতে ১০ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে বাবু খান রোডের সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। হামলাকারীরা দুই চিকিৎসকের কক্ষ, কাউন্টার ও একটি টেলিভিশন ভাঙচুর করে। জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সেখানে গুলিও করা হয়।
পরদিন দুপুরে একই মালিকের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র মহড়া দেয় দুর্বৃত্তরা। সেখানে উপস্থিত এক চিকিৎসকের ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরের শামসুর রহমান রোডের আব্দুল্লাহ প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ক্যানসারের নমুনা সংগ্রহের বিষয়কে কেন্দ্র করে হামলা হয়েছে বলে প্রথমে জানা গেলেও পরে চাঁদার বিষয়টি সামনে আসে। ভাঙচুরের সময় সন্ত্রাসীরা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এ ঘটনায়ও মামলা হয়নি।
এর চার দিন পর গতকাল শনিবার দুপুরে খানজাহান আলী রোডের অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে হামলা হয়। প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ। সম্প্রতি কারাগার থেকে বের হওয়া একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর এক সদস্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপককে হুমকি দেন বলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
নগরে আরও অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে, যেখানকার কর্তৃপক্ষ মানসম্মান ও প্রাণের ভয়ে নীরবে চাঁদা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের চয়নিকা ফার্মেসির ব্যবস্থাপককে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া হয়। ভয়ে ব্যবস্থাপক পালিয়ে গেছেন। ঘটনার পর থেকে ফার্মেসিটি বন্ধ রেখেছেন মালিক।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লোকমান হোসেন বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে হামলার ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। সন্ধানীর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। ওই মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
খানজাহান আলী রোডের অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলার ঘটনায়ও কর্তৃপক্ষ থানায় কোনো অভিযোগ করেনি বলে জানান ওসি। তিনি বলেন, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে নগরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
খুলনার নাগরিক সমাজের নেতা আইনজীবী বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে চাঁদাবাজি, হামলা ও ভাঙচুর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; গত কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বহিঃপ্রকাশ।
বাবুল হাওলাদার আরও বলেন, সন্ত্রাস ও অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া, দ্রুত জামিন পেয়ে এই সন্ত্রাসী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একের পর এক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হচ্ছে; কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। প্রশাসন ও সরকার উদাসীন। ফলে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া।
খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার রেজাউর রহমান বলেন, ভুক্তভোগীরা মামলা করছেন না এবং পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও করছেন না। দ্রুত জামিনের বিষয়টিও রয়েছে। এই দুই কারণে খুলনায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
রকিবুল ইসলাম বকুল জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে তাঁরা খুব উদ্বিগ্ন। কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন বলেও তিনি জানান।
রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘আমরা সরকারি দল এবং বিরোধী দল বুঝি না। আমরা জনগণ, জনগণের প্রতিনিধি। জনগণের পক্ষে আছি। কোনোভাবেই সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য থাকতে দেওয়া হবে না। প্রশাসন কঠিন ব্যবস্থা না নিলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমরা মাঠে নামব।’
সন্ত্রাস দমনে আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা হয়েছে এবং আইনমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছেন বলে জানান রকিবুল ইসলাম বকুল। এ বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।









