Ajker Patrika

খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি: অবাধে কাটা পড়ছে পাহাড়

  • জরিমানা ও মামলা করেও থামানো যাচ্ছে না পাহাড় কাটা
  • গত তিন মাসে অন্তত পাঁচটি পাহাড় কাটা পড়েছে
  • নিচু জমি ভরাট ও উন্নয়নকাজে বালুর বিকল্প হিসেবে মাটি ব্যবহৃত হচ্ছে
  • তথ্য দিয়ে সবাই সহযোগিতা করলে পাহাড় রক্ষা সহজ: ইউএনও
আবদুল মান্নান, মানিকছড়ি (খাগড়াছড়ি) 
খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি: অবাধে কাটা পড়ছে পাহাড়
পাহাড় কেটে মাটি সাবাড়ের এই চিত্র খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার এয়াতলংপাড়ার। গত মঙ্গলবার তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলায় গত তিন মাসে বড়সড় অন্তত পাঁচটি পাহাড় কেটে মাটি লুট করা হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাত যত গভীর হয়, ততই বাড়তে থাকে মাটিখেকোদের দৌরাত্ম্য। আর লুট করা পাহাড়ের মাটি বালুর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে। এই সময়ে প্রশাসনের পৃথক অভিযানে চারটি মামলায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে একটি নিয়মিত মামলাও করা হয়েছে। তবু থামানো যাচ্ছে না পাহাড় কাটা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উঁচু-নিচু টিলা (পাহাড়) আর সমতলে ঘেরা সবুজ জনপদ মানিকছড়ি উপজেলার এয়াতলংপাড়া, মহামুনি, ডাইনছড়ি, ধর্মঘর, মলঙ্গীপাড়া, গোদাতলী, চেঙ্গুছড়া, বড়বিল, তুলাবিল, কালাপানি, বাটনাতলী এলাকায় সদ্য পাহাড় কেটে মাটি সাবাড়ের চিত্র। এসব টিলা সাবাড় করা মাটি পাশের নিচু জমি ভরাট, কোথাও কোথাও উন্নয়নমূলক কাজে বালুর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। যদিও সরকারি উন্নয়নকাজ-সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী তা অস্বীকার করেছেন।

গত শুক্রবার বিকেলে মহামুনির অদূরে লেমুয়া ঘনবসতিপূর্ণ একটি পাহাড় কাটার দৃশ্য ধারণ করতে গেলে জায়গার মালিক হেফাজত ইসলাম বলেন, ‘ঘর করার প্রয়োজনে আমাকে ইতিপূর্বে মাটি কাটতে গিয়ে প্রশাসন কর্তৃক জরিমানা গুনতে হয়েছে। মাটি কেটে ঘর করার প্রয়োজন হওয়ায় চুপিসারে গত পরশু রাতে (বুধবার) জনৈক এক্সকাভেটর মালিককে ৬ হাজার টাকা দিয়ে মাটি কাটিয়েছি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এয়াতলংপাড়ার জনৈক ব্যক্তি বলেন, ‘মাস দেড়েক ধরে প্রায় রাতেই বালুমাটি মিশ্রিত একটি পাহাড়ে কেটে সাবাড় করা হচ্ছে! সাবাড় করা টিলার মাটি লাল বর্ণ এবং মাটিতে প্রচুর বালু! ফলে এসব মাটি নির্মাণকাজেও ব্যবহারযোগ্য! তাই রাত হলেই এক্সকাভেটরসহ ছোট ট্রাক, ট্রলি এসে অনায়াসে মাটি নিচ্ছে।’

বালুমিশ্রিত পাহাড়ের মাটি উন্নয়নকাজে ব্যবহার বিষয়ে জানতে চাইলে মানিকছড়ি উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) প্রকৌশলী মোহাব্বত আলী বলেন, ‘পাহাড়ের অধিকাংশ বালু মাটি মিশ্রিত, ফলে উন্নয়নকাজে ব্যবহৃত বালু কোথা থেকে আনা হয়, সেটি বোঝার সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী, নির্মাণকাজে কমপক্ষে পয়েন্ট ৫০ এফএম বালু থাকা আবশ্যক। কিন্তু এখানে ব্যবহৃত বালুতে ৩০ শতাংশ মাটির উপস্থিতি পাওয়া যায়। আমরা অবশ্যই বালুর উপস্থিতি বেশি (৫০-৭০ এফএম) থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করি।’

উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক বালু ও পাহাড় কাটাসংক্রান্ত তিনটি মামলায় ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা জরিমানা এবং পরিবেশ আইনে একটি নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কর্তৃক পাহাড় কাটায় একটি মামলায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও তাহমিনা আফরোজ ভূঁইয়া বলেন, ‘পাহাড় হচ্ছে প্রকৃতির পিলার। এটি রক্ষার দায়িত্ব সকলের। সচেতনতার অভাবে মানুষ অল্পস্বল্প প্রয়োজনেও পাহাড়ে আঁচড় বসায়! বিশেষ করে রাতের গভীরে জনমানবহীন এলাকায় যখন মাটিখেকোরা অসদুদ্দেশ্যে পাহাড় কাটে, তখন কেউ তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে না। আবার বিশ্বস্ত সূত্র ছাড়া গেলে দুর্বৃত্তরা এক্সকাভেটরের শব্দ বন্ধ করে নীরব থাকায় খুঁজে বের করা যায় না। এরপরও চলতি মাসসহ গত তিন মাসে চারটি অভিযানে পরিবেশ আইনে মামলাসহ প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তথ্য দিয়ে সবাই সহযোগিতা করলে এবং পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে এলে প্রকৃতির পিলার রক্ষা সহজ হবে। অন্যথায় কঠিন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত