Ajker Patrika

এপস্টেইন দ্বীপের রহস্যময় ‘মসজিদ’: পবিত্র কাবার গিলাফ ও কিসওয়া চুরির তথ্য ফাঁস

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
এপস্টেইন দ্বীপের রহস্যময় ‘মসজিদ’: পবিত্র কাবার গিলাফ ও কিসওয়া চুরির তথ্য ফাঁস
বর্গাকার একটি ঘর বানিয়ে সেটিকে নিজের মসজিদ বলে দাবি করছেন জেফ্রি এপস্টেইন। ছবি: সংগৃহীত

কুখ্যাত মার্কিন অর্থদাতা এবং নারী পাচারকারী জেফরি এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে নির্মিত রহস্যময় নীল-সাদা ভবনটি নিয়ে দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা অবশেষে কাটল। মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েক মিলিয়ন পৃষ্ঠার নথিপত্র এবং ই-মেইল চালাচালি থেকে জানা গেছে, এই ভবনটিকে এপস্টেইন একটি ‘মসজিদ’ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এর জন্য তিনি ইসলামের পবিত্রতম স্থান মক্কার ‘কাবার’ গিলাফ এবং কিসওয়া অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সংগ্রহ করেছিলেন। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

ক্যারিবিয়ান সাগরে এপস্টেইনের মালিকানাধীন লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে একটি নীল-সাদা ডোরাকাটা এবং সোনালি গম্বুজওয়ালা কিউব আকৃতির ভবন রয়েছে। নির্মাণকালে এটিকে সরকারি নথিতে ‘মিউজিক রুম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু এপস্টেইনের ব্যক্তিগত নথিপত্র ও শিল্পী ইয়ন নিকোলার সাক্ষ্য অনুযায়ী, এপস্টেইন এটিকে নিয়মিত তাঁর ‘মসজিদ’ বলে ডাকতেন।

২০০৩ সালে ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এপস্টেইন গর্ব করে বলেছিলেন, তাঁর কাছে বিশ্বের বৃহত্তম পার্সিয়ান গালিচা আছে যা কোনো এক মসজিদ থেকে সংগৃহীত। তাঁর এই ইসলামিক শিল্পকলার প্রতি মোহ শেষ পর্যন্ত তাঁকে মক্কার পবিত্র নিদর্শন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল।

২০১৭ সালে প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, এপস্টেইন সৌদি আরবের রাজদরবারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। এই নেটওয়ার্ক তাঁকে মক্কার কাবার তিনটি অমূল্য নিদর্শন পাইয়ে দিতে সাহায্য করে:

১. কাবার অভ্যন্তরের গিলাফ: কাবার ভেতরের দেয়ালে থাকা অত্যন্ত দুর্লভ কারুকাজ করা কাপড়।

২. কিসওয়া: কাবার বাইরের কালো প্রচ্ছদ, যা প্রতি বছর প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে স্বর্ণ ও রুপার সুতো দিয়ে তৈরি করা হয়।

৩. মক্কার বিশেষ কারখানার নিদর্শন: কাবার গিলাফ তৈরির জন্য নির্দিষ্ট মক্কার রাজকীয় কারখানা থেকে সংগৃহীত বিশেষ কাপড়।

সৌদি প্রতিনিধি আজিজা আল আহমাদি এক ই-মেইলে এপস্টেইনকে এই নিদর্শনের গুরুত্ব বুঝিয়ে লিখেছিলেন, ‘এই কালো অংশটি অন্তত ১ কোটি মুসলিমের স্পর্শ পেয়েছে। তাঁরা তাঁদের প্রার্থনা, চোখের পানি এবং আশা এই কাপড়ের গায়ে রেখে গেছেন।’ এপস্টেইন এই পবিত্র নিদর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে বা সেগুলো মেঝের গালিচা হিসেবে ব্যবহার করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলতেন।

বর্গাকার একটি ঘর বানিয়ে সেটিকে নিজের মসজিদ বলে দাবি করছেন জেফ্রি এপস্টেইন। ছবি: সংগৃহীত
বর্গাকার একটি ঘর বানিয়ে সেটিকে নিজের মসজিদ বলে দাবি করছেন জেফ্রি এপস্টেইন। ছবি: সংগৃহীত

নথিগুলো থেকে আরও জানা যায়, নরওয়েজীয় কূটনীতিক তেরজে রড-লারসেনের মাধ্যমে এপস্টেইন সৌদি আরবের বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। এপস্টেইন যুবরাজকে খুশি করতে ‘শরিয়াহ’ নামে একটি নতুন বৈশ্বিক মুদ্রার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ব্যবহৃত হবে। মূলত সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘আরামকো’র শেয়ার বাজারে আসার সময় তিনি যুবরাজের আর্থিক উপদেষ্টা হতে চেয়েছিলেন।

এপস্টেইনের এই তথাকথিত মসজিদটির স্থাপত্যও ছিল রহস্যময়। তিনি উজবেকিস্তান থেকে মসজিদের টাইলস আনিয়েছিলেন এবং সিরিয়ার ১৫শ শতাব্দীর ‘ইয়ালবুঘা হাম্মাম’ বা স্নানাগারের আদলে সোনালি গম্বুজ তৈরি করেছিলেন। তবে তাঁর অহংকারের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল তখন, যখন তিনি শিল্পীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ক্যালিগ্রাফিতে ‘আল্লাহ’ শব্দের বদলে তাঁর নিজের নামের আদ্যক্ষর ‘J’ ও ‘E’ খোদাই করতে।

২০১৯ সালে জেলখানায় এপস্টেইনের আত্মহত্যার পর তাঁর রহস্যময় জগৎ নিয়ে অনেক জল্পনা শুরু হয়। ২০১৭ সালের হারিকেন মারিয়া’র কবলে পড়ে দ্বীপের সেই ভবনের অনেক কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কাবার সেই পবিত্র নিদর্শনগুলো পরে উদ্ধার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টেইন কেবল একজন অপরাধীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ক্ষমতালোভী ব্যক্তিত্ব যিনি নিজের প্রভাব জাহির করতে বিশ্বের পবিত্রতম ধর্মীয় প্রতীকগুলোকেও নিজের ব্যক্তিগত বিলাসিতার খেলনা হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। মার্কিন বিচার বিভাগের এই নতুন তথ্যগুলো এপস্টেইন সাম্রাজ্যের সেই অন্ধকারের একটি ছোট অংশ মাত্র।

তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত