Ajker Patrika

ঐতিহ্য রক্ষার দাবিতে প্রতিবাদের মুখে ঝালকাঠির বারোচালা ভাঙা স্থগিত

ঝালকাঠি, প্রতিনিধি
ঐতিহ্য রক্ষার দাবিতে প্রতিবাদের মুখে ঝালকাঠির বারোচালা ভাঙা স্থগিত

ঝালকাঠি শহরের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী বারোচালা ভেঙে বহুতল বিপণিবিতান নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের মুখে ভাঙার কাজ আপাতত স্থগিত করেছে প্রশাসন। বৃহস্পতিবার সকালে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ অপসারণ শুরু হলে প্রতিবাদ জানায় স্থানীয় বাসিন্দা, সংস্কৃতিকর্মী, ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন নাগরিক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে বারোচালা ভাঙার কাজ আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

একই সঙ্গে বিষয়টি বিস্তারিত পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কমিটিতে প্রশাসনের প্রতিনিধি, মন্দির কর্তৃপক্ষ, ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষক, সুধীজন এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঝালকাঠি শহরের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজ জয় নারায়ণ ঘোষালের স্মৃতিবিজড়িত বারোচালাটি দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি পুরোনো স্থাপনাটি অপসারণ করে সেখানে বহুতল বিপণিবিতান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে আজ সকালে শ্রমিকরা ভাঙার কাজ শুরু করেন।

খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবি জানান। প্রতিবাদের পর প্রশাসনের উদ্যোগে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়।

জরুরি সভায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. কাওছার হোসেন, সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান, ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. আককাস সিকদার, শাহ আলম খলিফা, অলোক সাহা, কালীবাড়ি মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

কালীবাড়ি মন্দির পরিচালনা কমিটির উপদেষ্টা সুব্রত দেবনাথ বলেন, “স্থাপনাটি অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। মন্দির ও এর সম্পত্তির উন্নয়নের স্বার্থে বিপণিবিতান নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পূজার সময় পর্যাপ্ত জায়গার অভাব দেখা দেয়। সে কারণেই জায়গা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।”

ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবিতে সোচ্চার নাগরিকরা বলছেন, উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে নয়, বরং সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা উচিত।

ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. আককাস সিকদার বলেন, “এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, ঝালকাঠির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শতবর্ষের স্মৃতি বহনকারী এমন একটি স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেলে তা আর কখনও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই হওয়া উচিত।”

স্থানীয় বাসিন্দা শফিউল ইসলাম সৈকত বলেন, “বারোচালা শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এটি ঝালকাঠির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই স্থাপনাটি আমাদের অতীতের স্মৃতি বহন করে আসছে। শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটিকে ধ্বংস না করে সংরক্ষিত ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে, তবে তা অবশ্যই আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে।”

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের জানান, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বারোচালা ভাঙার কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী বারোচালা একসময় এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন সময়ে দেশের খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতা ও জননেতারা এখানে অনুষ্ঠিত সভা-সমাবেশে অংশ নিয়েছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত