Ajker Patrika

আজ ভবদহ দিবস: তলিয়ে গেছে ঘর, সড়কে সংসার বহু মানুষের

জাহিদ হাসান, যশোর 
আজ ভবদহ দিবস: তলিয়ে গেছে ঘর, সড়কে সংসার বহু মানুষের
বর্ষা মৌসুম শেষ, এখনো পানিবন্দী শতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

সাজানো-গোছানো সংসার ছিল ক্ষুদিরাম-চিত্রা বিশ্বাস দম্পতির। ঘরের আসবাব থেকে শুরু করে স্বপ্নের বসতভিটা—সবই এখন পানির নিচে। নিজের ঘর ছেড়ে গৃহপালিত পশু সঙ্গে নিয়ে এই সড়কের পাশেই আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা। এক-দুই দিন নয়, দীর্ঘ চার মাস এভাবেই কাটছে তাঁদের যাযাবর জীবন। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের এই দম্পতির টিনের ছাপড়া ঘরে অমানবিক জীবনযাপনের মধ্যেই হঠাৎ নেমে আসে আরেক অন্ধকার। স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন ক্ষুদিরামের স্ত্রী চিত্রা বিশ্বাস। কিন্তু জলাবদ্ধতায় ফসল ডুবে অর্থসংকটে যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে চিকিৎসার খরচ আসবে কোথা থেকে?

৫৫ বছর বয়সী ক্ষুদিরাম বলেন, ‘ঘরের মধ্যে এক হাত জল উঠেছিল। এখন কমে এক বিঘত দাঁড়িয়েছে। উঠানে কোমর সমান জল থাকলেও এখন হাঁটুজল। চার মাস ধরে রাস্তার ওপর আছি। একটা গরু আছে। এক পাশে গরু, অন্য পাশে আমরা থাকছি। স্ত্রী দুইবার স্ট্রোক করে খুবই অসুস্থ। আয়রোজগার তেমন নেই। ফসলও এই জলে মার গেছে। টাকাপয়সা নেই, চিকিৎসা করাব কী করে। তিনবারের খাওন একবেলা খাচ্ছি। এভাবে কি আর বাঁচা যায়? আমাগের এই দুক্কোডা কি আর দূর হবে না?’

যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলার নিম্নাঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে এই ভবদহ অঞ্চল। অভয়নগরের ভবানীপুর গ্রামে শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয়। পলি পড়ে এলাকার পানিনিষ্কাশনের মাধ্যম মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় বৃষ্টির পানিতে এলাকার বিলগুলো উপচে গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বর্ষা মৌসুম শেষ হয়েছে দেড় মাস আগে। কিন্তু সেই বর্ষার পানি নিষ্কাশিত না হওয়ায় শরতের শেষ সময়ে এসেও যশোরের দুঃখ খ্যাত ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ১০০ গ্রাম জলাবদ্ধ রয়েছে। বর্ষাকাল থেকে শুরু করে চার মাস ধরে এসব গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী জীবন যাপন করছে। বাড়ি থেকে রাস্তায় যাতায়াত করতে হচ্ছে সাঁকো অথবা ডিঙি নৌকায় করে। দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তির শিকার হয়ে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। ঘরবাড়ির পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও জলাবদ্ধ থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সাজানো-গোছানো সংসার ছিল ক্ষুদিরাম-চিত্রা বিশ্বাস দম্পতির। ঘরের আসবাব থেকে স্বপ্নের বসতভিটা—সবই এখন পানির নিচে। ছবি: আজকের পত্রিকা
সাজানো-গোছানো সংসার ছিল ক্ষুদিরাম-চিত্রা বিশ্বাস দম্পতির। ঘরের আসবাব থেকে স্বপ্নের বসতভিটা—সবই এখন পানির নিচে। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্থানীয়রা জানান, টানা কয়েক মাসের বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধ এলাকা হচ্ছে অভয়নগরের বলারাবাদ, বেদভিটা, ডুমুরতলা, আন্ধা, দিঘলিয়া, বারান্দী, কোটা, ডহর মশিয়াহাটী, রাজাপুর, সুন্দলী, ভাটবিলা, সড়াডাঙ্গা, হরিশপুর, ফুলেরগাতী এবং মনিরামপুরের হাটগাছা, সুজাতপুর, কুলটিয়া, লখাইডাঙ্গা, মহিষদিয়া, আলীপুর, পোড়াডাঙ্গা, পদ্মনাথপুর, পাড়িয়ালী, দহাকুলা, কুচলিয়া, নেবুগাতী, পাঁচকাটিয়া, ভুলবাড়িয়া, কুমারসীমা, কপালিয়া ও পাচাকড়ি। এসব গ্রামের কিছু পরিবার গরু-বাছুর ও হাঁস-মুরগি নিয়ে উঁচু সড়কের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ আবার বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন।

শনিবার সরেজমিন আলাপকালে বেদভিটা ও ডুমুরতলার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বর্তমানে পানি কিছুটা কমেছে। এক দিন বৃষ্টি হলে আবার পানি বেড়ে যাচ্ছে। পানি থাকায় ঘরের মধ্যে মাচা করে সেখানে তাঁরা থাকছেন।

ডুমুরতলা গ্রামের নিরাপদ বিশ্বাস বলেন, গ্রামের দেড় শ বাড়ির সব বাড়িতেই কমবেশি পানি। তাঁর বাড়ির উঠানেও পানি ছিল, তবে অনেকটা নেমে গেছে। নিরাপদ বিশ্বাসের বাড়ির জলাবদ্ধতার ছবি তুলতে গেলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এসব ছবি উঠায়ে কী হবে? কয়েক দিন পর পর আপনারা (সাংবাদিক) আসেন আর ছবি তুলে যান; আমাগের তো কোনো কাজ হলো না।’

বর্ষা মৌসুম শেষ, এখনো পানিবন্দী শতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
বর্ষা মৌসুম শেষ, এখনো পানিবন্দী শতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

সমস্যা সমাধানে চলমান প্রকল্প

ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে চার দশকে নেওয়া হয়েছে ২১টিরও বেশি প্রকল্প। খাল খনন, নদী সংস্কার, পানি নিষ্কাশন//// ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়েছে হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই দুর্ভোগ অব্যাহত থাকলেও হয়নি স্থায়ী সমাধান।

সবশেষ ২০২৪ সালে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) আওতায় সেনাবাহিনী ছয়টি নদী পুনঃখননের কাজ করছে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৯ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা।

প্রকল্পের আওতায় অভয়নগরের ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট থেকে ডুমুরিয়ার কাশিমপুর পর্যন্ত হরি নদের ১৫ কিলোমিটার, উপজেলার কাশিমপুর থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদীর ৫ কিলোমিটার, মনিরামপুরের বাকোশপোল থেকে কেশবপুরের বরেঙ্গা পর্যন্ত হরিহর নদীর ৩৫ কিলোমিটার, কেশবপুরের বরেঙ্গা থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত আপার ভদ্রা নদীর ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, অভয়নগরের গোঘাটা থেকে ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট পর্যন্ত টেকা নদীর ৭ কিলোমিটার এবং মনিরামপুরের লেহালপুর বাজার এলাকায় শ্রী নদীর ১ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে।

বর্ষা মৌসুম শেষ, এখনো পানিবন্দী শতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
বর্ষা মৌসুম শেষ, এখনো পানিবন্দী শতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

ইতিমধ্যে ৫৯ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে হরিহর নদের ৩৫ কিলোমিটার, আপার ভদ্রা নদীর ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং হরি নদের ৬ দশমিক ২৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর সঙ্গে যুক্ত ২৪টি খালের ৭৮ দশমিক ২৩০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে। আগামী বছরের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা।

পাউবোর যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলমান। এবার ভবদহ বিলে পানি বেড়ে প্রায় তিন ফুট হয়েছিল। ২১-ভেন্ট ভবদহ স্লুইসগেটের সব কটি কপাট খোলা রয়েছে। কপাট দিয়ে পানি বের হচ্ছে। খুব দ্রুত এই পানি নেমে যাবে।

যদিও টিআরএম চালু না হওয়ায় এসব প্রকল্পের টাকা অপচয় হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা। সংগঠনটির আহ্বায়ক গাজী আবদুল হামিদ বলেন, ‘সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী সংস্কারের কাজ চলমান থাকলেও টিআরএম চালু না হওয়ায় সে টাকা অপচয় হবে। নদী খননের পর পলি জমে তা দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ে (আইডব্লিউএম) প্রস্তাবনা অনুযায়ী মাঘী পূর্ণিমার আগেই (আগামী চার মাসের মধ্যে) একটি বিলে টিআরএম চালু না করা গেলে এবং আমডাঙ্গা খাল দ্রুত প্রশস্ত ও খনন না করা হলে এই জনপদের দুর্ভোগ কাটবে না।’

বর্ষা মৌসুম শেষ, এখনো পানিবন্দী শতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
বর্ষা মৌসুম শেষ, এখনো পানিবন্দী শতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

৫ অক্টোবর ভবদহ দিবস

বছরের পর বছর চলা এই দুর্ভোগ লাঘবে ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর যশোরের নওয়াপাড়ায় অবস্থান কর্মসূচি ও আন্দোলন করেন ভবদহপাড়ের হাজার হাজার মানুষ। সেদিন আন্দোলনকারীদের ওপর তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ভবদহ সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালীসহ শতাধিক মানুষ আহত হন। ওই ঘটনায় কেউ আহত হয়ে চোখ হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন পা। হামলায় গুরুতর আহত হয়ে এখনো অনেকে দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

হামলায় আহত ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘জলাবদ্ধতার দুঃখ লাঘবে বছরের পর বছর সংগ্রাম করে যাচ্ছে ভবদহপাড়ের মানুষ। তেমনি একটি দিন ছিল ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর। সেদিন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ হামলা চালায়। সেই ঘটনায় দুই চোখে আঘাত পান রণজিৎ বাওয়ালী। পরবর্তীকালে তাঁর দুই চোখই নষ্ট হয়ে যায়। দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও তিনি ভবদহের মানুষের জন্য লড়াই করতে করতে গত মাসে মারা যান। এভাবে আরও অনেকেই আহত হওয়ার দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে জীবন পার করছেন। দুঃখের বিষয় হলো, সেই হামলার এখনো বিচার হয়নি।’

২০১৬ সালের ঘটনার পর থেকে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর ভবদহ দিবস পালন করছেন জলমগ্ন এলাকার মানুষ। এদিন পদযাত্রা ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ভবদহ সংগ্রাম কমিটি। সোমবার বিকেল চারটায় নওয়াপাড়া থেকে পদযাত্রা করে ভবদহপাড়ের ২১-ভেন্টের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করবেন নেতৃবৃন্দ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত