Ajker Patrika

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি: উত্তাপহীন নির্বাচনে ভোট শুরু আজ

এস এম নূর মোহাম্মদ, ঢাকা 
আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ০৯: ২৭
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি: উত্তাপহীন নির্বাচনে ভোট শুরু আজ
সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতি । ছবি: সংগৃহীত

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হতে যাচ্ছে দুই বছর পর। আওয়ামীপন্থীরা অংশ নিতে পারছেন না এবারের নির্বাচনে। বিএনপি, জামায়াত জোট ও এনসিপি-সমর্থক আইনজীবীরা পৃথকভাবে প্যানেল দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। কয়েকজন প্যানেলে না থেকে ব্যক্তিগতভাবে অংশ নিয়েছেন। তবে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা নির্বাচনে লড়তে না পারায় অনেকটাই উত্তাপ হারিয়েছে এবারের নির্বাচন। যদিও প্রচার-প্রচারণার কমতি নেই প্রার্থীদের। বিগত সময়ে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের বিপরীতে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ প্যানেল দিতেন। এবার তাঁরা পৃথক প্যানেল দিয়ে অংশ নিচ্ছেন। তাই এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্যানেলের মধ্যে।

জানতে চাইলে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের নীল প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আজকের পত্রিকাকে বলেন, পুরো প্যানেলের বিজয়ে আশাবাদী তাঁরা। আওয়ামীপন্থীদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁরা ফ্যাসিস্টের দোসর। নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের সদস্য। এ জন্যই তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। তবে তাঁরা ভোট দিতে আসবেন কি না সেটা তাঁদের বিষয়।

গত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলেও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে এনসিপি পৃথক প্যানেল দিয়েছে। আর জামায়াতের প্যানেলে রয়েছে বাকি ১০ দল-সমর্থিতরা। যদিও ১৪ সদস্যের কমিটিতে সম্পাদক, সহসম্পদক ও চার সদস্যসহ ছয় পদে প্রার্থী দিয়েছে এনসিপি-সমর্থিতরা। তবে সব পদে প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিত প্যানেল।

জানতে চাইলে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের সবুজ প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী এ কে এম রেজাউল করিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, তাঁরা প্রতিটি ভোটারের কাছে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন। গণসংযোগে ভোটারদের বিপুল সাড়াও পেয়েছেন। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম প্রচার দেখে অনেকটা ভীত হয়ে পড়েছে। তারা ঢাকা বারের মতো এখানেও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করার জন্য পরিকল্পনা করছে বলে শুনতে পাচ্ছি। তবে সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে এ ধরনের কোনো অপতৎপরতা চালানো হলে কঠোর হস্তে প্রতিহত করা হবে।

এদিকে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের প্রার্থিতা বাতিল করায় অনেকেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাই ঢাকা আইনজীবী সমিতির মতো সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি অনেক কম হতে পারে। আইনজীবীরা বলছেন, সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয়ভাবে এখানে নির্বাচন হয় না। একসময় স্বতন্ত্রভাবেই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতেন আইনজীবীরা। পরবর্তীকালে প্যানেল করে অংশ নেওয়ার প্রচলন শুরু হলেও অনেকে এখনো ব্যক্তিগতভাবেও অংশ নেন। তবে প্যানেলের বাইরে থাকা কেউ সেভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেন না ভোটের মাঠে।

ভোটে অংশ নিতে না পেরে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী মুনসুরুল হক চৌধুরী গত ২৮ এপ্রিল লিখিত বক্তব্যে বলেন, কেউ কোনো দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দাখিল করেননি। ২৬ এপ্রিল বারের তথাকথিত বিশেষ সাধারণ সভার নোটিশ কোনো প্রার্থীকে না দিয়ে এডহক কমিটি মধ্যরাতে মেসেজ দিয়ে মনগড়া সভা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। যা অবৈধ ও নিন্দনীয়। ৪০ জনের বেশি প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার অপপ্রয়াস অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক, ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। বিশেষ সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত বাতিল করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান তিনি।

আইনজীবীরা বলছেন, অতীতে প্যানেল হলেও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তাঁদের মধ্যে। দুই প্যানেলের প্রার্থীরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ভোটের প্রচার চালালেও কখনো কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ছিল উৎসবমুখর। তবে সেই পরিবেশ নষ্ট হয়েছে আওয়ামী লীগের শেষ দিকে ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের নির্বাচন ছিল নজিরবিহীন। সে সময় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবিতে অনড় থেকে ভোট গ্রহণে বাধা দেয় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। পরে পুলিশ ডেকে তাঁদের ওপর হামলা করা হয়। ওই সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন গণমাধ্যমকর্মীরাও। পরে একতরফা নির্বাচন করে পুরো প্যানেলে জিতে নেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা।

সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ২০২৪ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ১৪ পদের মধ্যে সভাপতি ও সদস্যের তিনটি পদসহ চারটিতে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা জয়ী হন। আর সহসভাপতির দুটি পদ, সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ ও সহসম্পাদকের দুটি পদ এবং সদস্যের চারটিসহ ১০টি পদে জয় পান আওয়ামী লীগ-সমর্থিত আইনজীবীরা। তবে ভোট গ্রহণের পর জাল ভোট ও কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানান বিএনপি-সমর্থিত প্যানেল থেকে সম্পাদক প্রার্থী হওয়া ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস।

জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পর বাকি সময়ের জন্য সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৪ সদস্যবিশিষ্ট অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট সমিতি মিলনায়তনে তলবি সাধারণ সভায় ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেখানে এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনকে সভাপতি ও রুহুল কুদ্দুস কাজলকে সম্পাদক করা হয়। তবে ব্যারিস্টার কাজল দায়িত্ব পালন করতে অসম্মতি জানালে মাহফুজুর রহমান মিলনকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমিটির মেয়াদ শেষে ২০২৫ সালের মার্চে নির্বাচন করার কথা থাকলেও তা হয়নি।

এক বছর মেয়াদি সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে ১৪টি পদের বিপরীতে এবার শেষ পর্যন্ত লড়ছেন ৪০ জন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি-সমর্থিত প্যানেলের ৩৪ জন। বাকি ছয়জন প্যানেলের বাইরে স্বতন্ত্রভাবে অংশ নিচ্ছেন। আজ ও কাল দুদিন ভোট গ্রহণের পর গণনা শেষে শুক্রবার ফলাফল ঘোষণা হতে পারে। এবারের নির্বাচনে ভোটার ১১ হাজার ৪৯ জন। ভোট গ্রহণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বুথ স্থাপন করা হয়েছে।

সমিতির বিধান অনুসারে, ৩১ মার্চ পর্যন্ত কমিটির মেয়াদের বাধ্যবাধকতা থাকে। তাই চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত তফসিল অনুসারে গত ১১ ও ১২ মার্চ সমিতির এবারের নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। তবে অনেকে নির্বাচনের তারিখ পেছানোর জন্য লিখিত আবেদন করেন। এরপর ১ মার্চ সমিতির বিশেষ সভা ডেকে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা হয়। সে অনুযায়ী ঘোষিত নতুন তারিখে আজ ভোট গ্রহণ শুরু হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত