Ajker Patrika

যাত্রাবাড়ীতে যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে আটকে রেখে নির্যাতন, ১১ দিনেও মামলা নেয়নি পুলিশ

জহিরুল আলম পিলু 
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ২১: ৩৩
যাত্রাবাড়ীতে যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে আটকে রেখে নির্যাতন, ১১ দিনেও মামলা নেয়নি পুলিশ
প্রতীকী ছবি

দেশে কঠোর যৌতুক নিরোধ আইন থাকলেও সমাজে কোনোভাবেই থামছে না যৌতুক দেওয়া-নেওয়ার কুপ্রথা। প্রতিনিয়ত যৌতুকের থাবায় শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন গৃহবধূরা।

এমন এক ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে। যৌতুকের টাকা এনে দিতে না পারায় শামসুন্নাহার হীরা নামের দুই সন্তানের জননীকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করেছেন তাঁর স্বামী মাহাবুবুল আলম ওরফে টিটু। নির্যাতন চালিয়েই ক্ষান্ত হননি পাষণ্ড স্বামী, হীরাকে ঘর থেকে বের হতে বা চিকিৎসা নিতে না দিয়ে কক্ষের বাইরে থেকে তালা আটকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। ১৪ জুন রাতে যাত্রাবাড়ীর পশ্চিম মোমেনবাগ স্কুল রোড আড়াবাড়ি এলাকার একটি ভবনে এই বর্বর ঘটনা ঘটে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার সদর থানার বল্লভদী গ্রামের হানিফ খারাজির মেয়ে শামসুন্নাহার হীরার সঙ্গে ২০১৯ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় যাত্রাবাড়ীর পশ্চিম মোমেনবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. মাহাবুবুল আলম ওরফে টিটুর (৪৩)। বিয়ের সময় কনের পরিবার সাধ্যমতো কাঠের আলমারি, ফ্রিজ, খাট, সোফা সেট, সোনার আংটি, কানের দুলসহ লাখ লাখ টাকার আসবাব যৌতুক হিসেবে দেয়।

কিন্তু বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই বাপের বাড়ি থেকে আরও টাকা এনে দেওয়ার জন্য হীরার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন স্বামী মাহাবুবুল, শাশুড়ি ও তাঁর দুই ননদ। তাঁদের নির্যাতন সইতে না পেরে বাধ্য হয়ে বাপের বাড়ি থেকে ৫ লাখ টাকা এনে স্বামী মাহাবুবুলের হাতে তুলে দেন হীরা। এর মধ্যে তাঁদের সংসারে একটি ছেলে ও একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়।

অভিযুক্ত মাহাবুবুল আলম একটি বেসরকারি ব্যাংকে (পদ্মা ব্যাংক) চাকরি করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর চাকরি ও বেতন-ভাতার সমস্যার কথা বলে ব্যবসা করার অজুহাতে নতুন করে স্ত্রীর কাছে টাকা দাবি করেন। মেয়ের সুখ ও সংসারের শান্তির কথা চিন্তা করে হীরার মা বিউটি আক্তার নিজের জমানো সঞ্চয় এবং বড় মেয়ের জামাইয়ের কাছ থেকে ধার করে মাহাবুবুলকে ৬ লাখ টাকা এনে দেন।

কিন্তু সেই লোভের যেন শেষ নেই। ওই টাকা দেওয়ার কিছুদিন পর আবারও বাপের বাড়ি থেকে নতুন করে আরও ৫ লাখ টাকা এনে দিতে চাপ দেন মাহাবুবুল। হীরা এবার টাকা এনে দিতে সম্পূর্ণ অপারগতা প্রকাশ করলে তাঁর ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন।

১৪ জুন রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে টাকা না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মাহাবুবুল তাঁর তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে ঘরের দরজা বন্ধ করে হীরাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করেন। হীরা যাতে বাইরে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে বা কাউকে কিছু জানাতে না পারেন, সে জন্য কক্ষের বাইরে থেকে তালা দিয়ে রাখা হয়। পরে হৃদয়বিদারক এই খবরের আভাস পেয়ে হীরার মা দ্রুত যাত্রাবাড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালা ভেঙে হীরাকে উদ্ধার করে তাঁর মায়ের কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

কিন্তু এই নৃশংস ঘটনার পর যাত্রাবাড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার ১১ দিন পার হয়ে গেলেও আজ (২৫ জুন) পর্যন্ত পুলিশ কোনো মামলা রেকর্ড করেনি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত স্বামী মাহাবুবুল আলমের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি মারধরের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে। বিষয়টি এখন আমরা পারিবারিকভাবে মীমাংসা বা আপস করার চেষ্টা করছি।’

যাত্রাবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রাজু বলেন, ‘আমরা লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে ভুক্তভোগী শামসুন্নাহারকে উদ্ধার করেছি এবং তাঁর মায়ের জিম্মায় সোপর্দ করেছি। এই ঘটনায় মামলা দায়েরের আইনি প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া চলছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত