Ajker Patrika

তনু হত্যা মামলা

তনুর পোশাক থেকে চতুর্থ ব্যক্তির ডিএনএ শনাক্ত

কুমিল্লা প্রতিনিধি
আপডেট : ১৮ মে ২০২৬, ১০: ৫২
তনুর পোশাক থেকে চতুর্থ ব্যক্তির ডিএনএ শনাক্ত
সোহাগী জাহান তনু। ছবি: সংগৃহীত

বহুল আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। তনুর পোশাক থেকে এবার আরও একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারজনে।

মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, তনুর পোশাক ও বিভিন্ন আলামত পরীক্ষায় আগেই তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। সর্বশেষ ফরেনসিক বিশ্লেষণে উদ্ধার হওয়া এক টুকরো কাপড়ে রক্তের নমুনা থেকে নতুন একজন ব্যক্তির ডিএনএ শনাক্ত করা হয়েছে, যা আগের তিনজনের কারও সঙ্গে মেলেনি।

গতকাল রোববার (১৭ মে) রাতে পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘তদন্তে নতুন একটি ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এর ফলে মামলার তদন্তে নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। আমরা সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে কাজ করছি।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসসংলগ্ন কালভার্ট এলাকার ঝোঁপ থেকে তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা বিভিন্ন আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডির ডিএনএ ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। প্রায় ১০ বছর পর সেই পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।

পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরীকুল ইসলাম গত ২৩ এপ্রিল প্রতিবেদনটি হাতে পান এবং ২৫ এপ্রিল কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতে প্রতিবেদনটি দাখিল করে তা নথিভুক্ত করার আবেদন করেন।

সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তনুর ওড়না, সালোয়ার ও অন্তর্বাসে তিনজন ভিন্ন ব্যক্তির শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায়। পাশাপাশি একটি কাপড়ে থাকা রক্তের নমুনা থেকে আরও একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এই ডিএনএ আগের তিনজনের কারও সঙ্গে মেলেনি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তনুর কামিজ ও অন্তর্বাসে পাওয়া রক্তের নমুনা তাঁর নিজের ডিএনএর সঙ্গে মিলেছে। তবে ভ্যাজাইনাল সোয়াব ও কিছু আলামতে বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্ত অগ্রগতি জানতে গত এপ্রিল মাসে তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতে তলব করা হয়। পরে সন্দেহভাজন তিনজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেন আদালত। এরই মধ্যে একজন সাবেক সেনাসদস্যকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পিবিআই। তবে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে দাখিল করা আবেদনে সন্দেহভাজন তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের সার্জেন্ট বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের গড়ঘাটার মো. জাহিদুজ্জামান (৩৮), স্ট্যাটিক সিগন্যালের ওয়ারেন্ট অফিসার টাঙ্গাইল সদরের হোগড়া গ্রামের মো. হাফিজুর রহমান (৪২) এবং সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের সৈনিক কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুরের গোবিন্দপুর গ্রামের মো. শাহিন আলম (২৭)।

পিবিআই সূত্র জানায়, আদালতের নির্দেশে সন্দেহভাজনদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে অবসরে থাকা ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২২ এপ্রিল তাঁকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি কর্মকর্তারা।

সূত্র আরও জানায়, সন্দেহভাজন অন্য দুজনের একজন বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন এবং অপরজন আত্মগোপনে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

নিহত তনুর বাবা ইয়ার হোসেন শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, তাঁর মেয়ের হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তি জড়িত। তিনি অভিযোগ করেন, ‘সেনানিবাসের মতো নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এ ধরনের ঘটনা একা কারও পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয়। প্রকৃত অপরাধীদের এখনো আড়াল করা হচ্ছে।’

২০১৬ সালের ওই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ধর্ষণের আলামত না পাওয়ার কথা বলা হলেও পরবর্তী ময়নাতদন্তে যৌন নির্যাতনের প্রমাণ মেলে। এ নিয়ে সে সময় ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

তদন্তে একাধিকবার সংস্থা ও কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তবে সাম্প্রতিক ডিএনএ প্রতিবেদনের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তনু হত্যা মামলা। আগামী ৮ জুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন আদালত।

ঘটনার দিন রাতে টিউশনি শেষে বাসায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন তনু। পরে সেনানিবাস এলাকার একটি ঝোঁপ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে তাঁর জুতা, মোবাইল ফোনের কভার ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যার আগে কিংবা পরে ঘটনাস্থল পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত