Ajker Patrika

‘আমার সন্তানটাকে তুমি দেখে রেখো’—আত্মহত্যার আগে স্ত্রীকে বিকাশকর্মীর শেষ মেসেজ

শফিউল আলম রাজীব, দেবিদ্বার (কুমিল্লা)
‘আমার সন্তানটাকে তুমি দেখে রেখো’—আত্মহত্যার আগে স্ত্রীকে বিকাশকর্মীর শেষ মেসেজ
নিহত ফয়সাল (২৫)। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লার দেবিদ্বারে ছিনতাই হওয়া বিকাশের টাকা পরিশোধে বিকাশ কোম্পানির ম‍্যানেজারের চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ফয়সাল মিয়া (২৫) নামের এক যুবকের আত্মহত্যার অভিযোগ উঠেছে। আজ বুধবার (২৭ মে) বিকেলে নিহত ফয়সালের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন‍্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে পাঠিয়েছে। নিহত ফয়সাল দেবিদ্বার পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বড়আলমপুর গ্রামের সাবেক সেনাসদস‍্য নাছির উদ্দিন বাচ্চু মিয়ার ছেলে।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ফয়সাল মুরাদনগর উপজেলার কোম্পানীগঞ্জ এম এস নিজাম উদ্দিন আহমেদ বিকাশ ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্সিতে কর্মরত ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে বিকাশের আট লাখ টাকা নিয়ে ট্রানজেকশনের উদ্দেশ্যে বের হন। বেলা ১টার দিকে মুরাদনগর উপজেলার ডালপা এলাকায় তিনি ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়েন। ছিনতাই চক্রের সদস‍্যরা তাঁকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে মারাত্মক আহত করে। ফয়সাল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০টি সেলাই দেওয়া হয়।

ওই ঘটনায় বিকাশ কোম্পানির ম্যানেজারকে সঙ্গে নিয়ে মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানায় লিখিত অভিযোগ করেন ফয়সাল। পরে বিকাশ কোম্পানির ম‍্যানেজার রিপন মিয়া টাকা পরিশোধের জন‍্য নানাভাবে তাঁকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। ফয়সাল ঈদের পর বিষয়টি নিষ্পত্তি করার অনুরোধ করেন। কিন্তু ম‍্যানেজার রিপন মিয়া ঈদের আগেই ফয়সালা করার চাপ দেন। নচেৎ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাধ‍্য হবেন বলেও জানান।

এ ছাড়া ফয়সাল বিভিন্নভাবে কয়েক লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত ছিলেন। একদিকে নিজের কোরবানির পশু কেনার সামর্থ্য নেই, সন্দেহজনক মিথ্যা অভিযোগের অপবাদ, অন্যদিকে টাকার চাপ—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ সইতে না পেরে গতকাল মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুরে কেরির ট্যাবলেট (কীটনাশক) খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন ফয়সাল।

স্থানীয় ও পরিবারের লোকজন তাঁকে প্রথমে গৌরীপুর ও পরে কুমেক হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে সিট না পেয়ে জেলা সদরে রোকেয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানেই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সকালে মারা যান ফয়সাল।

এ ব‍্যাপারে নিহত ফয়সালের বাবা নাছির উদ্দিন বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘ছিনতাই হয়ে যাওয়া টাকা পরিশোধ করতে আমার ছেলেকে বিকাশ কোম্পানি থেকে চাপ দেওয়া হয়। এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আমার ছেলেটা আত্মহত্যা করল। আমি এর বিচার চাই।’

নিহত ফয়সালের স্ত্রী আয়শা আক্তার জানান, দুই বছর হলো তাঁদের বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগে থেকেই ফয়সাল বিকাশে চাকরি করতেন। কিন্তু সেদিন তাঁর স্বামীকে ছিনতাইকারীরা ছুরিকাঘাত করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সেই টাকা পরিশোধ করতে ম্যানেজার তাঁর স্বামীকে চাপ দিতেন। তিনি আয়শাকে বলতেন, ‘আয়শা আমি কাদের জন্য এত দিন কাজ করলাম! এই টাকা নাকি আমাকেই পরিশোধ করতে হবে। আমি এখন কী করব?’ মৃত্যুর আগে শেষ ভয়েস মেসেজে তিনি আয়শাকে বলেছিলেন, ‘তোমার সঙ্গে আর কোনো দিন কথা হবে না আয়শা। তুমি আমার ছেলেটাকে দেখে রেখো। কোনো দিন আর দ্বিতীয় বিয়ে করো না, আয়শা।’

তিন মাসের সন্তানটাকে নিয়ে আয়শা কীভাবে বাঁচবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা এখন।

এ বিষয়ে বিকাশ ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ম্যানেজার অভিযুক্ত রিপন মিয়া বলেন, ‘আমরা তাঁকে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করিনি। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ার সংবাদে তাঁকে গিয়ে দেখে আসি। চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। গত সোমবার (২৫ মে) ফয়সালসহ আমরা বাঙ্গরা বাজার থানায় যাই। সেখানে ফয়সাল বাদী হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এ সময় ফয়সাল কিছু অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তা বললেও এ নিয়ে আমরা কিছু বলিনি। সত্যতা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। পরে ১০০ টাকা নিয়ে তিনি বাড়িতে চলে আসেন। এখন তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে অফিসের লোকজন পাঠিয়েছি।’

এ বিষয়ে দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, সংবাদ পেয়ে ফয়সাল নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত