Ajker Patrika

কক্সবাজারে শ্মশান দখল করে লবণ ও চিংড়ি চাষ, বিপাকে রাখাইন সম্প্রদায়

মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার
আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ১৬: ৫৯
কক্সবাজারে শ্মশান দখল করে লবণ ও চিংড়ি চাষ, বিপাকে রাখাইন সম্প্রদায়
কক্সবাজার সদরের চৌফলদণ্ডীতে শ্মশানের এক কোনায় চলছে মরদেহ দাহক্রিয়া। বাকি শ্মশানজুড়ে লবণ চাষের মহোৎসব। ছবি: আজকের পত্রিকা

কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নে রাখাইন সম্প্রদায়ের অন্তত ২০০ বছরের প্রাচীন শ্মশানভূমির তিন একরের বেশি জমি দখল করে লবণ ও চিংড়ি চাষের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী পরিবার প্রায় দুই যুগ ধরে চার একর আয়তনের এই শ্মশানের বড় একটি অংশ দখল করে চাষ করছে। এতে মরদেহ সৎকার ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পাদনে চরম বিপাকে পড়েছে রাখাইন জনগোষ্ঠী।

কক্সবাজার শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে সাগর উপকূলের চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্যম রাখাইনপাড়ায় প্রায় ৮০০ পরিবারের বসবাস। এই পাড়ার মরদেহ সৎকারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় পাশাপাশি দুটি প্রাচীন শ্মশান রয়েছে।

রাখাইন সম্প্রদায়ের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী ফজলুল হক মিন্টু, তাঁর ভাই লাল মিয়া লালু, এয়ার খান ও একরামুল হক প্রায় দুই যুগ ধরে শ্মশানের সিংহভাগ জমি দখল করে শুষ্ক মৌসুমে লবণ চাষ এবং বর্ষায় চিংড়ি চাষ করছেন।

চৌফলদণ্ডী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য উবাচিং রাখাইন জানান, ২০০১ সালে রাখাইন সম্প্রদায়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০ থেকে ২৫০ বছর আগের শ্মশানটির চার একর জায়গা জেলা প্রশাসন শ্রেণি পরিবর্তন করে বরাদ্দ দেয়। পরে সরকারি ও ব্যক্তিগত অর্থায়নে সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়।

উত্তরপাড়া শ্মশান পরিচালনা কমিটির সভাপতি উথোইচিং রাখাইন বলেন, ‘এই শ্মশান আমাদের পূর্বপুরুষদের চিরনিদ্রার স্থান। এই লবণ মাঠের নিচে আমাদের পূর্বপুরুষের অন্তত এক হাজার সমাধি আছে। এসব সমাধির ওপরে হচ্ছে লবণ চাষ। এভাবে শ্মশানভূমি বেদখল হয়ে যাওয়ায় মরদেহ সৎকার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছি আমরা।’

শ্মশানভূমির উন্নয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার থেকে গ্রামের নারী-পুরুষ মিলে মাটি কাটার কাজ শুরু করেছেন। রাখাইন সম্প্রদায়ের নেতাদের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই দখলদারদের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার শ্মশানভূমি দখলমুক্ত করতে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু একটি জমির বিষয় নয়, এটি একটি সম্প্রদায়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়। আমরা এটি দখলমুক্ত করতে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছি। তিনি (জেলা প্রশাসক) এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।’

গতকাল রোববার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, পাশাপাশি লাগোয়া দুটি শ্মশানে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কেটে উন্নয়নকাজ করা হচ্ছে। এ সময় দুই গ্রামের শতাধিক নারী-পুরুষ বেড়িবাঁধে বসে পাহারা দিচ্ছিলেন।

রাখাইন বুদ্ধিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুব, ক্রীড়া ও ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক সুই চিং বলেন, ‘শ্মশান বেদখল হওয়ায় মরদেহ সৎকার নিয়ে আমরা চরম বেকায়দায় আছি। তাই বাধ্য হয়ে গ্রামবাসী জড়ো হয়ে শ্মশানের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরের কিছু অংশ মাটি কেটে ব্যবহারের উপযোগী করার চেষ্টা করছি। কিন্তু এখানেও বাধা আসছে।’

উত্তর রাখাইনপাড়ার খিং হ্লা রাখাইন (৪০) বলেন, ‘দখলদারেরা এলাকায় প্রভাবশালী। এমনকি শ্মশানের উন্নয়নকাজে তারা দফায় দফায় বাধা দিচ্ছে। আমরাও পালাক্রমে পাহারা দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। তবে খুব ভয়ের মধ্যে আছি।’

রাখাইন সম্প্রদায়ের নেতা ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক উথোইন য়াইন বলেন, ‘এই এলাকার হাজারো পূর্বপুরুষের সমাধি লবণ মাঠে চাপা পড়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। শুধু শ্মশান নয়, নানা সামাজিক সংকটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই সম্প্রদায় অস্তিত্ব বিলীনের পথে।’

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একজন ফজলুল হক মিয়া মিন্টু জানান, শ্মশানভূমিসহ আশপাশের ১০ একর জমির বন্দোবস্ত তাঁদের রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, এ বিষয়ে কাগজপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত