Ajker Patrika

চট্টগ্রাম বন্দর: ধর্মঘটের রেশ কাটেনি বহির্নোঙরে জাহাজজট

  • টার্মিনালে ৪০ হাজারের বেশি কনটেইনার জমে আছে
  • বহির্নোঙরে ৩৮টি জাহাজ অপেক্ষায় রয়েছে
  • পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অন্তত তিন সপ্তাহ লাগবে
  • বন্দরের জট কমাতে কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে: পরিচালক
 আবু বকর ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দর: ধর্মঘটের রেশ কাটেনি বহির্নোঙরে জাহাজজট
শ্রমিক ধর্মঘট ও নির্বাচনী ছুটির কারণে বন্দরে জাহাজ ও কনটেইনারের জট আরও বেড়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগেও মিলছে না সুফল। গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরে। ছবি: আজকের পত্রিকা

কয়েক দিনের শ্রমিক ধর্মঘটের রেশ এখনো কাটেনি চট্টগ্রাম বন্দরে। এরপর গেছে ৪৮ ঘণ্টার নির্বাচনী ছুটি। সব মিলিয়ে বন্দরে জাহাজ ও কনটেইনারের জট আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বহির্নোঙরে ৩৮টি জাহাজ অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া টার্মিনালে ৪০ হাজারের বেশি কনটেইনার জমে আছে। বন্দরসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগেও সুফল মিলছে না।

সিলেট শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) ‘ফেনজ হাই-৬৬’ যোগে ডেনমার্ক থেকে সার উৎপাদনের জন্য পাঁচ কনটেইনার কাঁচামাল ‘প্রাইমারি রিফরমিং ক্যাটালিস্ট’ আমদানি করে। ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজটি বার্থিং পাওয়ার কথা। সাত দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার জাহাজ থেকে পণ্যগুলো নামানো হয়। এভাবে আরও শত শত কোম্পানির কাঁচামাল বা আমদানিকারকের পণ্য নিয়ে অসংখ্য জাহাজ সাগরে ভাসছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক মাস থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটার সংকটের কারণে শতাধিক জাহাজ অপেক্ষায় ছিল। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে শ্রমিক আন্দোলন এবং ৪৮ ঘণ্টার নির্বাচনী ছুটিতে বন্দরে ফের জাহাজ ও কনটেইনারের জট তৈরি হয়। এতে ৪০ হাজারের বেশি কনটেইনার জমে যায়। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে বন্দরে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টিইইউস কনটেইনার থাকে। বহির্নোঙরে ৩০ থেকে ৩৫ জাহাজ অপেক্ষায় থাকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক দাবি করেন, এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। কনটেইনার-জটও কিছুটা কমছে। আশা করি, শিগগির এই সংকট কেটে যাবে। বন্দরের জট কমাতে কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে।

ওমর ফারুকের দাবি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কড়াকড়ি অবস্থান, টানা অভিযান এবং লাইটার জাহাজ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর ফলে বহির্নোঙরে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। গত ১৭ জানুয়ারি বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ ছিল ১০৪টি। ১৭ ফেব্রুয়ারি সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৮০টিতে। রমজান উপলক্ষে আমদানি করা খাদ্যশস্য ও নিত্যপণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা ৫২ থেকে কমে ৩৮ হয়েছে। আগে যেখানে মাদার ভেসেলকে লাইটার জাহাজ বরাদ্দ পেতে দুই থেকে তিন দিন অপেক্ষা করতে হতো, এখন প্রতিদিনই সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাল্ক পণ্য খালাসে কিছুটা গতি পাচ্ছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে সপ্তাহব্যাপী শ্রমিক আন্দোলন ও ৪৮ ঘণ্টার নির্বাচনী ছুটির সঙ্গে শুক্রবার ও শনিবার ছুটির প্রভাব টার্মিনালগুলোতে সৃষ্ট কনটেইনার জট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

ওমর ফারুক বলেন, ‘এখনো প্রায় ৩৯ হাজার কনটেইনার রয়েছে। থাকার কথা ৩০-৩২ হাজার কনটেইনার।’

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ পাওয়ার পর জানুয়ারির মাঝামাঝি আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়। একই সঙ্গে সব নিবন্ধিত লাইটার জাহাজকে রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে সংকট কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, আরও কয়েক দিন লাগবে।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সরওয়ার হোসেন সাগর বলেন, গত এক মাস থেকে লাইটার-সংকটে জাহাজজট কিছুটা কমছে। ভাসমান গুদাম রোধে অভিযান ১৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে বিভিন্ন নৌপথে ৭৮৯টি লাইটার জাহাজ পরিদর্শন করে অধিদপ্তরের টাস্কফোর্স।

ডিজি শিপিংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬২৭টি জাহাজ ১০ দিন পর্যন্ত, ১২৮টি ১০ দিনের বেশি এবং ৩৪টি ২০ দিনের বেশি সময় নোঙর করে ছিল; যা কার্যত ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহারের শামিল এবং অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন বিধিমালার লঙ্ঘন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত পণ্য খালাসের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং মোট ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

কর্মকর্তারা বলেন, দীর্ঘ সময় নোঙর করে থাকায় নৌচলাচল ব্যাহত হচ্ছিল এবং বহির্নোঙর ও অভ্যন্তরীণ রুটে জট তৈরি হচ্ছিল।

ডিজিটাল সিরিয়াল ও স্বচ্ছ বরাদ্দ ৩০ জানুয়ারি লাইটার ভেসেল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার চালু করা হয়। এর মাধ্যমে সিরিয়াল প্রদান, বরাদ্দ ও কমপ্লায়েন্স মনিটরিং ডিজিটাল করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় পতেঙ্গা নির্ধারিত জোনে পৌঁছালে জাহাজের কর্মীরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আগের ট্রিপের বোট নোটের ছবি আপলোড করে সিরিয়ালের আবেদন করতে পারেন। জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে আগে এলে, আগে পাবেন নীতি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের সহ-সমন্বয়ক পারভেজ আহমেদ বলেন, সফটওয়্যার চালুর পর কোনো লাইটার জাহাজ দীর্ঘ সময় অলস রাখা যাচ্ছে না। ফলে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড বেড়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই মিটিং করে মাদার ভেসেলে লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে। কনটেইনার জট এখনো চ্যালেঞ্জ। বাল্ক কার্গো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও কনটেইনার সেক্টরে চাপ রয়ে গেছে। মাসের প্রথম সপ্তাহের শ্রমিক আন্দোলন এবং ৪৮ ঘণ্টার নির্বাচনী ছুটির কারণে টার্মিনালে ৪০ হাজারের বেশি কনটেইনার জমে যায়, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে থাকে ৩০ থেকে ৩২ হাজার। গত দুই দিনে দৈনিক প্রায় ১০ হাজার টিইইউস হ্যান্ডলিং এবং প্রায় ৪ হাজার টিইইউস ডেলিভারি হয়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘ধর্মঘট ও ছুটিতে প্রায় ১০ হাজার টিইইউস অতিরিক্ত জমেছে। এগুলো সরাতে অন্তত তিন সপ্তাহ লাগবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত