Ajker Patrika

নারী দিবস: ৩৩ বছর ধরে জনসেবা করে যাচ্ছেন ফটিকছড়ির ফিরোজা বেগম

ইউসুফ আরফাত, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
নারী দিবস: ৩৩ বছর ধরে জনসেবা করে যাচ্ছেন ফটিকছড়ির ফিরোজা বেগম
ফিরোজা বেগম। ছবি: আজকের পত্রিকা

চোখে দৃঢ়তা, কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস আর মুখে সব সময় একটুখানি হাসি— এই রূপেই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মানুষ চেনে ফিরোজা বেগমকে। বয়স প্রায় ৫৮। কিন্তু কাজের উদ্যমে এখনো তিনি তরুণদের মতো প্রখর। টানা ৩৩ বছর স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর মধ্যে ক্ষমতার অহংকার নেই; আছে শুধু মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময়ই বিয়ে হয়েছিল ফিরোজা বেগমের। কিন্তু সেই সংসার টেকেনি। ফিরে আসতে হয় বাপের বাড়ি। জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা ছিল সেটিই। তবে এই ধাক্কাই যেন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

ফিরোজা বেগম বলেন, ‘অনেকে ভাবে, একটা ভাঙা জীবনের পর মেয়েরা থেমে যায়। আমি চেয়েছিলাম প্রমাণ করতে, থেমে না গিয়ে নতুন করে শুরু করাই আসল সাহস।’ বাপের বাড়ি ফিরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজেকে বিলিয়ে দেবেন সমাজসেবায়। আশপাশের দরিদ্র মানুষ, অসহায় নারী ও শিশুদের পাশে দাঁড়ানোই হবে তাঁর জীবনের লক্ষ্য।

১৯৮৭ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি মাতৃকেন্দ্রের সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পরে মাঠকর্মীর দায়িত্বও পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। সেখান থেকেই তাঁর মনে জন্ম নেয় নতুন ভাবনা। তিনি বুঝতে পারেন, জনগণের বড় পরিসরে সেবা করতে হলে জনপ্রতিনিধি হতে হবে।

১৯৯২ সালে ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে ‘গোলাপ ফুল’ প্রতীকে নির্বাচন করেন ফিরোজা বেগম। ফলাফল বিপুল ভোটে জয়। সেই জয় ছিল তাঁর নিজের, নারীর এবং মানবসেবার জয়। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। চারবার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, তিনবার ফটিকছড়ি পৌরসভার সংরক্ষিত কাউন্সিলর এবং তিনবার প্যানেল মেয়র—সব মিলিয়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি জনপ্রতিনিধি হয়ে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ তিন দশকের পথচলায় ফিরোজা বেগম প্রমাণ করেছেন প্রতিকূলতা মানুষকে ভাঙে না, যদি ভেতরে থাকে মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর সেবার অদম্য তাগিদ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ফিরোজা বেগম এখনো বড় আশ্রয়ের নাম। কেউ অসুস্থ, কারও ঘর ভেঙে গেছে, আবার কারও মেয়ের বিয়ে সব খবরই পৌঁছে যায় তাঁর কাছে।

ফিরোজার ভাই মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, ‘আপা কোনো দিন না বলেন না। মানুষের সেবা করতে করতে নিজের কথাই ভুলে যান। বিপদে-আপদে সব সময় মানুষের পাশে থাকেন।’

এই দীর্ঘ সময়ে ফিরোজা বেগমের ঝুলিতে শুধু পদবি নয়, কাজের স্বীকৃতিও জমেছে। ২০২৩ সালে তিনি ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কার্যক্রমের আওতায় সমাজ উন্নয়নে অবদানের জন্য উপজেলা পর্যায়ের জয়িতা সম্মাননা পান। এ ছাড়া সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন থেকেও পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা।

ফিরোজা বেগম বলেন, ‘সবচেয়ে বড় পুরস্কার মানুষের ভালোবাসা। যখন দেখি আমার কারণে কারও মুখে হাসি ফুটেছে, তখন মনে হয়, এটাই জীবনের আসল সফলতা। অনেক সময় কটুকথাও শুনতে হয়। মহিলা হয়ে এসব কাজ করি বলে কেউ কেউ হাসে। কিন্তু আমি জানি, আমি জনগণের কাজ করছি, এটাই আমার গর্ব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত