Ajker Patrika

জয়পুরহাটের হাস্কিং মিল: সরকারি চুক্তিতে অচল মিল সচল

  • খাদ্য বিভাগের নথিতে সচল দেখানো বহু হাস্কিং মিল বাস্তবে বিদ্যুৎ সংযোগহীন।অনেক মিলের উৎপাদন বন্ধ, দীর্ঘদিন ধরে অচল।
  • তদন্ত কমিটি, প্রক্রিয়া শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
মো. আতাউর রহমান, জয়পুরহাট 
দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ, অচল ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে হাসকিং মিল। সম্প্রতি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার ইটাখোলা এলাকার রাজিব চালকল (বাঁয়ে) ও একই এলাকার পোদ্দর চালকল। ছবি: আজকের পত্রিকা
দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ, অচল ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে হাসকিং মিল। সম্প্রতি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার ইটাখোলা এলাকার রাজিব চালকল (বাঁয়ে) ও একই এলাকার পোদ্দর চালকল। ছবি: আজকের পত্রিকা

চলতি আমন মৌসুমে সরকারি মূল্যে চাল সংগ্রহ কার্যক্রমে জয়পুরহাট জেলার পাঁচ উপজেলায় হাস্কিং মিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য বিভাগের নথিতে সচল দেখানো বহু হাস্কিং মিল বাস্তবে বিদ্যুৎ সংযোগহীন, উৎপাদন বন্ধ কিংবা দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকলেও এসব মিলের নামেই সরকারি খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

খাদ্য বিভাগের তালিকা ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জয়পুরহাট সদর, ক্ষেতলাল, কালাই, পাঁচবিবি ও আক্কেলপুর—এই পাঁচ উপজেলাতেই হাস্কিং মিলগুলোর বাস্তব অবস্থা প্রায় একই। তালিকাভুক্ত বহু মিল দীর্ঘদিন ধরে চালু নেই। কোথাও মিল ভবন পরিত্যক্ত, কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, আবার কোথাও মিলের স্থানে খড়ের পালা কিংবা কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটে বর্তমানে ১৭টি অটো রাইস মিল এবং ২৫৭টি হাস্কিং মিল তালিকাভুক্ত রয়েছে।

সরেজমিনে জেলার পাঁচ উপজেলার অন্তত ৫০টি হাস্কিং মিল ঘুরে এবং ২০-২৫ মিল মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত ২৫৭টি হাস্কিং মিলের মধ্যে অন্তত ১৫০টি মিল শুধু কাগজে সচল থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এসব মিলে ধান ভাঙানো, চাল শুকানো কিংবা মান নিয়ন্ত্রণের মতো কোনো কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই হচ্ছে না।

খাদ্য বিভাগের নথি অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে হাস্কিং মিলের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সেদ্ধ চাল সংগ্রহের চুক্তি করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত অনেক হাস্কিং মিলের নিজস্বভাবে ধান ভাঙা, চাল বাছাই কিংবা মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার মতো সক্ষমতা নেই।

স্থানীয় মিল মালিক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বাস্তবে হাস্কিং মিল মালিকদের প্রায় সবাইকে চাল বাছাই ও মানোন্নয়নের জন্য অটো রাইস মিলের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে হাস্কিং মিলের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে অন্য মিল কিংবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, সরেজমিনে অচল বা সীমিত সক্ষমতাসম্পন্ন মিলের নামে কীভাবে সরকারি খাদ্য সংগ্রহের বরাদ্দ দেওয়া হলো এবং সংগৃহীত চালের মান যাচাই কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মেসার্স চৌধুরী অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী এবং ক্ষেতলাল উপজেলা মিল মালিক সমিতির সভাপতি রওনকুল ইসলাম টিপু চৌধুরীর অটো রাইস মিলটি ২০২২ সাল থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও চাল সরবরাহের বরাদ্দ পায়। বর্তমানে তিনি বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছেন। কিন্তু পল্লী বিদ্যুৎ অফিস থেকে সে বিষয়ে কোনো কাগজ উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে না আসায় তার নামে বরাদ্দকৃত চাল গ্রহণ করেনি উপজেলা খাদ্য বিভাগ।

কাগজে সচল থাকলেও মাঠে অচল ক্ষেতলাল উপজেলার ইটাখোলা এলাকার রাজিব চালকল, যার স্বত্বাধিকারী খলিলুর রহমান। এ তালিকায় আছে একই এলাকার পোদ্দর চালকল; যার স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী।

খাদ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জয়পুরহাটে হাস্কিং মিলভিত্তিক চাল সংগ্রহ ব্যবস্থা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কাগুজে সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে বরাদ্দ দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে অস্বচ্ছতা তৈরি হচ্ছে। তাদের মতে, হাস্কিং মিলের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই, বিদ্যুৎ সংযোগ ও কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে অটো রাইস মিলভিত্তিক একটি স্বচ্ছ সংগ্রহকাঠামো গড়ে তোলা না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠবে।

জানতে চাইলে জেলা মিল মালিক সমিতির সভাপতি লায়েক আলী বলেন, বিগত সরকারের চাল সংগ্রহ নীতিমালার কারণে হাস্কিং মিল মালিকেরা চরম সংকটে পড়েছেন। তারা চাল সরবরাহের যে বরাদ্দ পান, তা ছাঁটাই-বাছাইসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার জন্য অটো রাইস মিলের কাছে যেতে হয়। এতে হাস্কিং মিল মালিকেরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অটো মিল মালিকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

লায়েক আলী আরও বলেন, সরকার যে চাল সংগ্রহ করে তা ত্রাণ এবং অন্যান্য সরকারি সহায়তা কার্যক্রমে বিতরণ করা হয়। এসব চাল নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী প্রস্তুত না হলে গ্রহণ করা হয় না। নীতিমালা সংশোধনের দাবিতে খাদ্য বিভাগসহ মন্ত্রী ও সচিব পর্যায়েও একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি।

জেলা মিল মালিক সমিতির সভাপতির বক্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক শাকিল আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারি নীতিমালার কারণেই এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। নীতিমালার বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ কারও নেই।

ভবিষ্যতে নীতিমালার পরিবর্তনের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদী।

এ বিষয়ে ক্ষেতলাল উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক শামীমা আখতার বলেন, ‘আমি সদ্য এ উপজেলায় যোগদান করেছি। আমার যোগদানের পূর্বে বরাদ্দের জন্য মিলের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। সে ক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে। নীতিমালা মেনেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

জেলা খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাস্কিং মিলসংক্রান্ত অভিযোগ এবং পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বাংলাদেশের বাহিনীগুলোর কোনো পদক্ষেপ ভারতের বিরুদ্ধে নয়: ভারতীয় সেনাপ্রধান

ইরানে বিক্ষোভে ১২ হাজার নিহতের খবর, সরকার বলছে ২ হাজার

হাসপাতালে আশ্রয় নেওয়া গৃহবধূকে ধর্ষণ: দুই আনসার সদস্য বরখাস্ত

শেখ হাসিনাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করল পিবিআই

১০ বছর পর দম্পতির কোলজুড়ে একসঙ্গে পাঁচ সন্তান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত