Ajker Patrika

ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে অবমুক্ত হচ্ছে বাঘিনীটি, নজরদারিতে ২০ ক্যামেরা

কাজী শামিম আহমেদ, খুলনা
ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে অবমুক্ত হচ্ছে বাঘিনীটি, নজরদারিতে ২০ ক্যামেরা
ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে আগামী রোববার সুন্দরবনে ফিরে যাচ্ছে বাঘিনীটি। ছবি: সংগৃহীত

শিকারির ফাঁদ থেকে উদ্ধারের পর দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসা শেষে সুস্থ হওয়া বাঘিনীটিকে আগামী রোববার সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক বনাঞ্চলে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন বিভাগ। বাঘিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ৮ কিলোমিটার এলাকায় ২০টি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। অবমুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় চিকিৎসক, বাঘ বিশেষজ্ঞ ও বন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চারটি দল গঠন করা হয়েছে।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, বাঘিনীটিকে ১২ জুলাই সকালে খুলনা থেকে নদীপথে নিয়ে আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে ছাড়া হবে। বন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সম্প্রতি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর আগে গত ২১ মে বাঘিনীটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রাণী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জুম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মত ছিল, বাঘিনীটি বয়সে প্রবীণ হওয়ায় বনে ছাড়ার পর তার গতিবিধি নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। সে কারণে স্যাটেলাইট কলার কিংবা মাইক্রোচিপের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

অপর অংশের মত ছিল, বাঘিনীটির জীবনকাল শেষ পর্যায়ে চলে আসায় বন্য পরিবেশে অন্য পশুর সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। এ পরিস্থিতিতে সুস্থ হওয়ার পর প্রাণীটিকে বনে না ছেড়ে কোনো সাফারি পার্কে রাখা উচিত।

বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, `বাঘের জীবনকাল সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এই বাঘিনীর বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণীটি হারানো ক্ষিপ্রতা ও গতি ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে এর ওজন প্রায় ৯০ কেজি।'

বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) ইমরান আহমেদ বলেন, `সুস্থ হয়ে বাঘিনীটি আগের চেহারায় ফিরেছে। ৯ ফুট দৈর্ঘ্যের বাঘিনীর ওজন বেড়ে হয়েছে ৯০ কেজি। তার ক্ষিপ্রতা বেড়েছে। সে এখন শিকার ধরে খেতে পারবে।'

তিনি বলেন, বনে ছাড়ার পর বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বাঘিনীটির গলায় একটি কলার পরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় বিদেশ থেকে সেটি আনা সম্ভব হয়নি। এখন ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে তার গতিবিধি দেখা হবে। সে লক্ষ্যে আন্ধারমানিক বনাঞ্চলের ৮ কিলোমিটার জুড়ে ২০টি গোপন ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হয়েছে।

ইমরান আহমেদ আরও বলেন, ২০২৪ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে বাঘিনীটিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিনবার শনাক্ত করা হয়েছিল। সুন্দরবনে বাঘ ছেড়ে দেওয়ার সময় বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীসহ বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বাঘ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত থাকবেন।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, `আগামী রোববার সকালে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বনাঞ্চলে বাঘটিকে ছেড়ে দেওয়া হবে। খুলনা থেকে নদীপথে বাঘিনীটিকে আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে নেওয়া হবে।'

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল জানান, বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার জন্য অভিজ্ঞ ও প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী চিকিৎসক, বাঘ বিশেষজ্ঞ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চারটি দল গঠন করা হয়েছে। দলগুলো হলো— বাঘের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিকেল দল, বাঘের মানসিক ও আচরণগত সক্ষমতা পরীক্ষার জন্য বাঘ বিশেষজ্ঞ দল, বাঘটিকে ধরা, পরিবহন ও অবমুক্ত করার জন্য বিশেষায়িত দল এবং বাঘের নিরাপত্তা ও বনসংলগ্ন জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবমুক্ত-পরবর্তী গতিবিধি নজরদারির জন্য পর্যবেক্ষণ দল।

নির্মল কুমার পাল বলেন, দলগুলো অন্তত এক বছর ধরে অবমুক্তকরণ এলাকার চারপাশে বাঘের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি দুপুরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকিরখালের অদূরে শিকারিদের পেতে রাখা হরিণ ধরার ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়ে বয়স্ক বাঘিনীটি। গুরুতর আহত অবস্থায় ৪ জানুয়ারি বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল সেটিকে উদ্ধার করে।

পরে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড বাঘিনীটির চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যা করে।

বন অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত জুলকারনাইন বলেন, উদ্ধারকালে বাঘিনীটি ছিল নিস্তেজ, দুর্বল ও ক্ষীণকায়। তার ভাষ্য, `সামনের বাঁ পায়ে প্রায় ৩ ইঞ্চি জায়গাজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদের রশিতে টানাটানির কারণে ক্ষতস্থানে পচন ধরেছিল। অ্যান্টিবায়োটিক ও নিয়মিত ড্রেসিংয়ের ফলে মার্চ মাসের দিকে ঘা শুকিয়ে আসে। বর্তমানে ক্ষতস্থান ভরাট হয়ে সেখানে লোমও গজিয়েছে।'

বন বিভাগ সূত্র আরও জানায়, বাঘিনীটির খাদ্য ও চিকিৎসায় মাসে ২ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। প্রাণীটিকে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ কেজি তাজা মাংস খেতে দিতে হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত