Ajker Patrika

শরীয়তপুরে বিস্ফোরণ: বোমা তৈরির উপকরণ ও আলামত সংগ্রহ, ৩৮টি বোমা নিষ্ক্রিয়

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ৩৮
জাজিরায় উদ্ধার হওয়া ৩৮টি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা
জাজিরায় উদ্ধার হওয়া ৩৮টি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

শরীয়তপুরের জাজিরায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল থেকে হাতবোমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করেছে পুলিশের ক্রাইম সিন ইউনিট ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম। একই সঙ্গে কয়েক দিনে পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৩৮টি তাজা হাতবোমা নিরাপদভাবে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।

আজ শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে পুলিশের সিআইডি ক্রাইম সিন ইউনিট ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এরপর বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়া বসতঘর ও আশপাশের এলাকা তল্লাশি করে তাঁরা হাতবোমা তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ এবং বিস্ফোরণের আলামত সংগ্রহ করেন।

পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিমের পরিদর্শক শংকর কুমার ঘোষ জানান, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিমের দশজন সদস্য এবং সিআইডি ক্রাইম সিন ইউনিটের ছয়জন সদস্য একযোগে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করেন।

এ সময় ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরকদ্রব্য ও বোমা তৈরির উপকরণ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত উপকরণের মধ্যে রয়েছে পটাশ, গান পাউডার, টিনের কৌটা, মার্বেল, তারের কাঁটা, স্কচটেপ, পাথরের গুঁড়া, ধানের তুষ, জর্দার কৌটা, ভাঙা কাচ, স্প্লিন্টার এবং একটি মিক্সচার মেশিন। এসব আলামত জব্দ করে জাজিরা থানায় জমা দেওয়া হয়েছে।

জাজিরায় বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন উপকরণ জব্দ। ছবি: আজকের পত্রিকা
জাজিরায় বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন উপকরণ জব্দ। ছবি: আজকের পত্রিকা

বিকেলে গত কয়েক দিনে পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৩৮টি তাজা হাতবোমা ও বিস্ফোরকদ্রব্য জাজিরা উপজেলার বিলাসপুরের একটি নিরাপদ খোলা মাঠে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিলাসপুর ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে দুটি প্রভাবশালী পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে আসছে। এক পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন বিলাসপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারী এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল জলিল মাতবর।

জাজিরায় ৩৮টি বোমা করা হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা
জাজিরায় ৩৮টি বোমা করা হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

গত বছরের এপ্রিল ও নভেম্বর মাসে বিলাসপুর এলাকায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এসব ঘটনায় পুলিশ বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করে। মামলায় আব্দুল জলিল মাতবর বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। অপর দিকে ইউপি চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারী জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকা ছেড়ে গেছেন।

বর্তমানে কুদ্দুস ব্যাপারীর সমর্থক তাইজুল ইসলাম ছৈয়াল এবং জলিল মাতবরের সমর্থক নাসির ব্যাপারীর লোকজন এলাকায় নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

৩ জানুয়ারি বুধাইরহাট এলাকায় দুই পক্ষের লোকজন একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এর জেরে পরদিন সকালে বুধাইরহাট বাজারে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় বাজারের দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দুটি বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। সংঘর্ষ চলাকালে শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে জাবেদ শেখ নামে নাসির ব্যাপারীর এক সমর্থকের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

জাজিরায় বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন উপকরণ জব্দ। ছবি: আজকের পত্রিকা
জাজিরায় বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন উপকরণ জব্দ। ছবি: আজকের পত্রিকা

সবশেষ বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ভোরে মুলাই ব্যাপারীকান্দি গ্রামে বিলাসপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারীর বাড়ির পাশে তাঁর চাচাতো ভাই সাগর ব্যাপারীর একটি টিনের বসতঘর বোমা বিস্ফোরণে সম্পূর্ণ লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এতে এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘরটি নতুন নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেখানে এখনো কেউ বসবাস করতেন না বলে জানা গেছে।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলের অদূরে একটি ফসলের মাঠ থেকে তাইজুল ইসলাম ছৈয়ালের পক্ষের সমর্থক বলে পরিচিত সোহান ব্যাপারীর মরদেহ উদ্ধার করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

এ ঘটনায় নবীন সরদার ও নয়ন মোল্লা নামে তাইজুল ইসলাম পক্ষের আরও দুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নবীন সরদার মারা যান এবং নয়ন মোল্লা আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ বিষয়ে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহম্মদ জানান, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও সিআইডি ক্রাইম সিন ইউনিটের উদ্ধারকৃত আলামত ও প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে জাজিরা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বিগত কয়েকে বছরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। যাতে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার বিস্ফোরণে দুজন নিহত হন এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং অপরাধীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত