Ajker Patrika

চট্টগ্রাম বন্দর এবার পুরো অচল হচ্ছে

  • এত দিন বহির্নোঙরের কাজ চললেও আজ থেকে তাও বন্ধ রাখার ঘোষণা শ্রমিকদের
  • পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আজ সকালে নেতৃস্থানীয় ২০০ শ্রমিককে বৈঠকে ডেকেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম 
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯: ১০
চট্টগ্রাম বন্দর এবার পুরো অচল হচ্ছে
চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বন্দর আজ রোববার থেকে আবার অচল করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকেরা। কর্মবিরতি দুদিন স্থগিত রাখার পর আজ থেকে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পরিষদ এ ঘোষণা দেয়। এত দিন আন্দোলনে বন্দরের বহির্নোঙরের কাজ চললেও এবার সেই কাজও বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা সংকট নিরসনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কাছে একটি চিঠি দিয়েছেন তাঁরা।

এ ছাড়া বন্দরের অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরুর আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ‍্যাম বাংলাদেশ)।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আজ সকালে নেতৃস্থানীয় ২০০ শ্রমিককে বৈঠকে ডেকেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে ওই বৈঠকে শ্রমিকেরা যাবেন কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

রমজান মাস ও সংসদ নির্বাচনের আগে এই ধরনের পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্ট সবাই। বন্দরে জাহাজজট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ৬ হাজার রপ্তানি কনটেইনার আটকে রয়েছে। এর মধ্যে বহির্নোঙরেও কাজ বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।

এই বিষয়ে সিকম গ্রুপের কর্ণধার আমিরুল হক বলেন, সরকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মুখোমুখি অবস্থানের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়া সর্বশেষ সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।

লাগাতার কর্মবিরতির ঘোষণা: বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরকে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলসহ চার দফা দাবিতে এবার অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটির লিজ না দেওয়ার ঘোষণা, আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া এবং বন্দর চেয়ারম্যানের প্রত্যাহার।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতা হুমায়ুন কবীর গতকাল সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। কর্মসূচি ঘোষণা করেন সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন।

জাহাজ ও কনটেইনার জট: ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত ১৩৬টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান করে। এর মধ্যে ১১৯টি জাহাজ রয়েছে বহির্নোঙরে। সেখানে ৫২টি জাহাজে পণ্য খালাস কার্যক্রম চলছে। বহির্নোঙরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ৬৭ জাহাজ। এর মধ্যে ২৭টি কনটেইনারবাহী, ৩০টি জেনারেল কার্গো, ২২টি খাদ্যপণ্যবাহী, ৫টি চিনি, ৫টি সারবাহী ও ১৪টি অয়েল ট্যাংকার খালাসের অপেক্ষায় আছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাভাবিক সময়ে ৩০-৩৫টি জাহাজ বন্দরে অবস্থান করে।

এদিকে গত সপ্তাহে ৬ দিনের লাগাতার কর্মবিরতির ফলে চট্টগ্রামের ২১ অফডকে ৬ হাজারের মতো অতিরিক্ত রপ্তানি কনটেইনারসহ মোট ১৩ হাজার ৭০০ কনটেইনার আটকা পড়েছে।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকড়া) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, গত এক সপ্তাহের জাহাজ ও কনটেইনারজট এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে আবারও লাগাতার কর্মবিরতির ঘোষণা নতুন করে অস্থিরতার জন্ম দেবে। এতে রমজানের পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি চার ব্যবসায়ী সংগঠনের: বন্দরের সংকট নিরসনে প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।

চিঠিতে বলা হয়, আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল খালাস ব্যাহত হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

ইউরোচ্যাম বাংলাদেশের আহ্বান

গতকাল দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউরোচ‍্যাম বাংলাদেশ জানায়, বর্তমানে বন্দরের টার্মিনাল, বেসরকারি ডিপো ও জাহাজে আটকে থাকা প্রায় ১৩ হাজার কনটেইনারে আনুমানিক ৬৬ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা) রপ্তানি পণ্য আটকে আছে। এ পরিস্থিতিতে সংগঠনটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি বন্দরের পূর্ণাঙ্গ ও স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

২০০ শ্রমিককে ডাকল বন্দর: চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গতকাল বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের জারি করা একটি দাপ্তরিক চিঠিতে এই আহ্বান করা হয়। আজ সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে বন্দর ভবনের কনফারেন্স কক্ষে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পরিবহন বিভাগ থেকে ৫০ জন, যান্ত্রিক বিভাগ থেকে ৮০ জন, নিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে ২০ জন করে, অর্থ ও হিসাব বিভাগ থেকে ১৫ জন, পরিদর্শন বিভাগ থেকে ৫ জন এবং চিকিৎসা, প্রশাসনসহ অন্যান্য বিভাগ থেকে স্বল্পসংখ্যক কর্মচারীকে এতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।

এই বিষয়ে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন বলেন, শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরির জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ ওই জরুরি বৈঠক ডেকেছে। শ্রমিকেরা বৈঠকে যাবেন না।

একই বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, সকালে শ্রমিকেরা জরুরি বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলবেন।

এনসিটি আন্দোলন: এনসিটি পরিচালনা বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের প্রতিবাদে শ্রমিক সংগঠনগুলো থেমে থেমে আন্দোলন করে আসছে গেল সাত মাস ধরে। এরই ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহের ৬ দিন বন্ধ থাকে বন্দরের অধিকাংশ কর্মকাণ্ড। গত বৃহস্পতিবার নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বন্দরে এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ফল হিসেবে গত শুক্র ও শনিবার বন্দর সচল হয়। উপদেষ্টার কাছে শ্রমিকদের দাবি ছিল শনিবারের মধ্যে তাদের দাবির বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিতে হবে সরকার তথা বন্দর কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে গতকাল পর্যন্ত ইতিবাচক কোনো কিছু আসেনি বলে দাবি শ্রমিকদের।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত